আর্মা পর্বতমালা, আফগানিস্তান। দিনটি ছিল পহেলা মার্চ, ২০০২ সাল। শাহীকোটের বহুল পরিচিত অপারেশন অ্যানাকোণ্ডার H-Hour এর আর তখন বাকি মাত্র ২৪ ঘন্টা সময়। তীব্র ঠাণ্ডা ও সুউচ্চ পর্বতশ্রেণীর বাঁধা পেরিয়ে তাই শাহীকোট ঘিরে অবস্থান নিতে শুরু করেছে Advanced Force Operations (AFO) অপারেটরদের চৌকস দল। যাদের কমাণ্ডার হলেন Lieutenant Colonel Pete Blaber। ইঊনিটের সদস্যরা যাকে কিনা প্যানথার বলে ডাকতে পছন্দ করে।
LTC Pete Panther Blaber মূলত 1st Special Forces Operational Detachment - Delta এর একজন প্রভাবশালী লেফটেন্যান্ট কর্নেল। অফিসার হিসাবে নিজ ইঊনিটের অপারেটরদের মাঝে যার সুনাম অদ্বিতীয়। যদিও, আজকের এই দিনে আফগানিস্তানের মাটিতে তিনি কমাণ্ড করছেন খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু, চৌকস ও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইঊনিটকে। যারা মূলত তার নিজ ইঊনিট, SEAL Team SiX ও Task Force Orange এর কিছু অভিজ্ঞ কমাণ্ডোর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। সম্মিলিতভাবে AFO নামে যাদের পরিচয় দেওয়া হয়ে থাকে।
AFO এর অধীনে প্যানথারের সরাসরি কমাণ্ডে ছিল সেদিন সাকূল্যে ৪৫ জন। যাদের মাঝে বেশিরভাগ ছিল সাপোর্ট পার্সোনেল। অন্যদিকে শাহীকোটের পাহাড়ে তার আদেশ নিয়ে মূল অপারেশন পরিচালনার লক্ষ্যে যারা মোতায়েন হচ্ছিলেন, তাদের সংখ্যা হলো ১৩ জন। যাদের টিম সমূহের রেডিও কলসাইন ছিল India, Juliet ও MAKO 31।
যাদের মাঝে ইণ্ডিয়া ও জুলিয়েট ছিল 1st Special Forces Operational Detachment - Delta এর দু'টি রিকনাইস্যান্স টিম। আর MAKO_31 এর অপারেটরদের আগমন হয়েছিল SEAL Team SiX হতে। আমাদের আজকের মূহুর্তটিতে আমরা দেখছি আলোচ্য টিমটিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১১,০০০ ফিট উঁচু একটি পাহাড়ি অঞ্চল ধরে নিজেদের অবস্থানের দিকে অগ্রসরমান রয়েছে যারা।
Are There Brits Up There!
ফজরের পরবর্তী কিছু মূহুর্ত বয়ে চলছিল তখন। সিল টিম সিক্সের AFO টিম ততক্ষণে নিজেদের প্রাথমিক অবজারভেশন পোস্টে পৌঁছে গিয়েছে। ওখানে পৌঁছানোর সাথে সাথে টিম লিডার তাৎক্ষণিক তার দু'জন স্নাইপারকে পাথুরে শৈলশিরা ধরে ৫০০ মিটার সামনের আরেকটি অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য রওয়ানা করালেন। অপারেশনের মূহুর্তে আলোচ্য অবস্থানটি হবে তাদের চূড়ান্ত অবজারভেশন পজিশন। যার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার বিষয়ে সমতলে প্যানথারকে কথা দিয়ে এসেছেন তিনি।
সুতরাং, ভারী কুয়াশার আড়াল ও মেঘাচ্ছন্ন আকাশের নিচ দিয়ে স্নাইপারদ্বয় চলতে চলতে নির্দিষ্ট অবস্থানটির কাছে উপস্থিত হলো, আর সাথে সাথে চমকে যেতে হলো ওদের!
কারন, ওদের টিমের অবজারভেশন পজিশন যেখানে স্থাপন করার কথা হয়েছিল, ঠিক সে জায়গাটি ততক্ষণে অজ্ঞাত পরিচয় অপারেটরদের দখলে চলে গিয়েছে। সেখানে এখন পাথরের ছোট্ট দেওয়ালের পাশে দৃশ্যমান হয়েছে একটি ছাই রঙা বড় তাঁবু। আর, তার ঠিক পাশে নীল প্লাস্টিকের মোড়কে আবৃত একটি হেভি মেশিনগানের অবয়ব! অপারেটররা দেখতে পেলেন যে, ১,০০০ মিটার বিমান-বিধ্বংসী রেঞ্জের দানবীয় মেশিনগানটি এমন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে যে, উপত্যকার দিকে ধাবমান কোনো হেলিকপ্টার ওটার আওতার বাহির দিয়ে অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না। উপরন্তু আগামীকালের অপারেশনে আর্মির কমাণ্ডিং জেনারেলকে বহনকারী হেলিকপ্টার সহ তার হেডকোয়ার্টার্স এলিমেন্ট যেখানে অবস্থান নিবে, তার সরাসরি ওপরে হাজার হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থান নিয়েছে Al-Qaeda এর চৌকস গানার্স! প্যানথার তার একটি টিমকে এদিকে ইনসার্ট না করলে আগামীকালের অপারেশনটি আল-কায়েদা উদ্বোধন করতো সম্পূর্ণ অপারেশনের কমাণ্ড টিম ও রিজার্ভের মাঝে পরপারের টিকেট বিতরণের মাঝ দিয়ে! আর, সেখানেই তাঁরা ক্ষান্ত হয়ে যেতো এমনটি মনে করারও কোনো কারণ নাই। কারণ, তুষারের সফেদ চাদরের ক্যামোফ্লাজে আচ্ছাদিত গানারদের সামনে দিয়ে তারপর অতিক্রম করতো অপারেশনের মূল বাহিনী 101st Airborne Division এর সেনাদের বহনকারী চিনুকের বহর। আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের জ্বলন্ত করাতের মতো যাদের চিরে ফেলতো আলোচ্য গানারদের দল।
MAKO_31 এর স্নাইপারদ্বয় সাবধানতার সাথে অবস্থানটির ছবি তুলে ফেললো। তারপর প্রচণ্ড তুষার ঝড়ের আড়াল নিয়ে সতর্কতার সাথে ফিরে গেলো তাদের মূল টিমের কাছে। খানিকক্ষণ পর আবহাওয়া পরিষ্কার হলে পুনরায় আরো ভালো করে পর্যবেক্ষণের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো উপস্থিত হলো তারা।
গানারদের মাঝে দু'জনের চেহারা দৃশ্যমান হলো তখন। যাদের মাঝে একজনের মাথায় ছোট্ট করে ছাঁটা ঘন-কালো চুল, মুখে দাঁড়ি, দেখতে মধ্য এশিয়ার পুরুষদের অনুরূপ। তাঁকে ঊইঘুর যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত বলে ধারণা করা হলো। যাঁর সঙ্গী দ্বিতীয়জনকে দেখে মূল গানার বলে নিশ্চিত হলো মার্কিন অপারেটররা। তাঁদেরকে দেখে বেশ সুসজ্জিত ও চৌকস বলেই মনে হচ্ছিল। শারীরিক দিক হতেও যাদের সুঠামদেহী বলে বোঝা যাচ্ছিল। ঊইঘুর যোদ্ধা হিসাবে চিহ্নিত তরুণ অবসর পেলে শ্যাডো-বক্সিং করে সময় কাটাচ্ছিলেন। তাঁদের চেহারা দেখে এখানে বোঝায় উপায় ছিল না যে, তাঁরা আদতে আল-কায়েদার অপারেটিভ নাকি ইঊরোপিয়ান কোনো দেশের অধিবাসী।
অপারেটররা আরো কিছু ছবি তুললেন। তারপর ২০০ মিটার দূরে স্থাপন করা তাদের সাময়িক সাপোর্ট পজিশনে গিয়ে তাৎক্ষণিক প্যানথারের সাথে যোগাযোগ করলেন তারা। MAKO_31 এর টিম লিডার নিজস্ব মিনি-ল্যাপটপ হতে ছবিগুলো চলে গেলো তাদের কমাণ্ডারের কাছে। সাথে প্রশ্ন রাখা হলো, "আমাদের সাথে এখানে বৃটিশরা আছে কিনা!"
মূলত, মূল গানারের ইঊরোপিয়ান চেহারা ও দীর্ঘকায় অবয়ব দেখে তাঁকে ও তাঁর সম্পূর্ণ টিমকে 22 Special Air Service (22 SAS) বলে সন্দেহ করছিলো সিল টিম সিক্সের রিকনাইস্যান্স কমাণ্ডোরা। পাশাপাশি, তাঁদের পেশাদার ও চৌকস চলাফেরার ভঙ্গি হতে তাঁদের তেমন কিছু মনে হচ্ছিল না, সাধারণভাবে আল-কায়েদা যোদ্ধাদের সম্পর্কে যেমনটি ধারণা করা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে ওখানে থাকা একজন অপারেটর বিষয়টি সম্পর্কে বলেন যে, গানারের নায়কোচিত ধারালো চেহারা, লাল চুল আর দামি ইঊরোপিয়ান ব্র্যাণ্ডের মাউন্টেনিয়ারিং আঊটফিট ও শারীরিক গড়ন আর নড়া-চড়া ছিল আমাদের কাছে চোখ ধাঁধানো। আমরা আসলে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, এরা আমাদের শত্রুপক্ষের যোদ্ধা! সেখানে মেশিনগানের দ্বিতীয় ঊইঘুর গানারের কর্মকাণ্ডও ছিল দেখার মতো। তাঁর ১২.৭ মিলিমিটার বুলেট পজিশনের মাঝে দক্ষ হাতে Ergonomic ভাবে সাজানো ছিল। মেশিনগানের প্লাটফর্মটির উচ্চতা ওঠা-নামা করাবার ও নল রাখবার চমৎকার ব্যবস্থা করা ছিল সেখানে। সবমিলিয়ে, যেমনটি আগেই বলেছি, চোখ ধাঁধানো!
তবে, খানিকক্ষণ পরেই প্যানথারের জবাব উপস্থিত হলো। যেখানে সিল টিম সিক্স অপারেটরদের নিশ্চিত করা হলো যে, পাহাড়ে তোমাদের সাথে স্পেশাল এয়ার সার্ভিসের কোনো টিম অপারেট করছে না। পাল্টা জবাবে টিম লিডার তার কমাণ্ডারকে জানালেন যে,
"তাহলে আমি অপারেশনের H-Hour এর ০২ ঘন্টা থাকতে পজিশনিং শুরু করব। ০১ ঘন্টা পূর্বে এনগেজ করা হবে। তারপর আকাশে ভাসমান AC-130 দ্বারা ফলো-আপ শটস শুরু হবে। টার্গেটে আমরা সরাসরি দু'জন অপারেটিভকে হাজির দেখেছি। তবে, টার্গেটে আনুমানিক ০৫ জন আছে বলে আমরা অনুমান করি। এ-বিষয়ক আপনার যেকোনো সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিব।"
"Terminate With Extreme Prejudice"
বার্তা প্রেরণের অল্প কিছুক্ষণের মাঝে চলে এলো AFO কমাণ্ডারের চূড়ান্ত আদেশ। গুড হান্টিং! মিনি-ল্যাপটপের স্ক্রিনে শব্দদ্বয় দেখে টিম লিডার কিছুক্ষণ অবাক হয়ে রইলেন। কারণ, তার টিমের আকার ছোট্ট হওয়ার ফলে সাধারণত অন্যান্য অফিসাররা আগে অনুরূপ তৎপরতা পরিচালনার জন্য তাকে অনুমতি দেয়নি। অথবা চেষ্টা করেছে তাকে বিভিন্ন বুদ্ধি-পরামর্শ দেওয়ার। সেখানে প্যানথার স্রেফ দু'টি শব্দে তাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমি তোমার ওপর আস্থা রাখছি। তুমি যেমনটি চাও, করো।
দিন গড়িয়ে রাত নেমে এলো। সময় তখন মধ্যরাত। নীরব পদক্ষেপে শিকারের দিকে এগিয়ে এলো MAKO_31 এর তিন শুটার। সম্পূর্ণ দিন পাহাড়ের গানারদের সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণের পর তাঁদের ওরা যেমন চৌকস পেয়েছে, ঠিক তেমনি কিছু ভুলের সন্ধানও পেয়েছে ওরা। পর্যবেক্ষণ হতে ধরা পড়েছে যে, সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১১,০০০ ফিট উচ্চতায় থাকা নিজেদের দূর্গম পাহাড়ি ঘাঁটি তাঁদের মাঝে একটি আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। তাঁরা সেখানে নিজেদের হাত পকেটে রেখে হাঁটা-চলা করেন। কখনো কখনো নিজেদের স্মল আর্মসও সাথে রাখেন না তাঁরা! বাস্তবেও তাঁদের মনে করবার কোনো কারণ ছিল না যে, অমন ভয়াবহ তুষার ঝড়ের মাঝে এতখানি দূর্গম পর্বতমালার গহীনে কোনো মানুষ আগমন করার চিন্তা করতে পারে! তবে, তাঁদের যে বিষয়টি অজানা ছিল তা হলো, AFO এর দায়িত্ব হলো ঠিক এই অসাধ্য সাধনের প্রচেষ্টা চালানো।
আর, শেষপর্যন্ত এটিই তাঁদের জন্য বিপদ ডেকে আনলো। রাত ০৪:০০টা নাগাদ তিন জন শুটার যখন পাহাড়ের ঢালে অ্যাসল্টের জন্য পজিশন নিয়ে রয়েছেন, এসময় আচমকা অস্ত্রহীন অবস্থায় একজন যোদ্ধা ওদের ওপরে হাজির হলেন। এবং সরাসরি তার চোখে পড়লো উন্মুক্ত ঢালুতে ওঁত পেতে থাকা সিল টিম সিক্স অপারেটরদের ওপর। সাথে সাথে সতর্কতামূলক চিৎকার দিয়ে নিজস্ব তাঁবুর দিকে ছুটতে আরম্ভ করলেন তিনি। তাঁর পিছু নিয়ে শুরু হলো কমাণ্ডোদের অ্যাসল্ট।
অল্পক্ষণের মাঝে তুমুল ফায়ারফাইট শুরু হওয়ার পর নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। পিছু হটে পজিশন নেওয়ার চেষ্টা করা দু'জনকে আকাশে ভাসমান AC-130H এর ফায়ার দ্বারা হত্যা করলো সিল টিম সিক্সের ছোট্ট কমাণ্ডো দল। ওদিকে, AC-130H এর ফায়ারিংয়ের আওয়াজ শেষ হতে না হতে আচমকা সমগ্র উপত্যকা যেন বিস্ফোরিত হয়ে পড়লো! উপত্যকার স্থানে স্থানে ঘাঁটি গেড়ে থাকা এতক্ষণ পর্যন্ত অজ্ঞাত আল-কায়েদা পজিশন হতে আকাশে ভাসমান গানশিপের দিকে গুলিবর্ষণ শুরু হতেই Team India, Team Juliet ও MAKO_31 এর কাছে দৃশ্যমান হয়ে গেলো তাঁদের পজিশন। যেগুলো সম্পর্কে ইতিপূর্বে ওদের কোনো ধারণা ছিল না। ওনারা তড়িৎগতিতে ওসব ফায়ারিংয়ের অবস্থান নিজেদের কাছে টুকে রাখলেন। পরবর্তীতে ওসব জায়গাতে বিমান হামলার জন্য বিমানকে গাইড করা হবে।
কিছুক্ষণের মাঝে MAKO_31 ভারী মেশিনগান পজিশনটির দখল নিয়ে ওখানে নিজেদের ঘাঁটি স্থাপন করলো। মেশিনগানটির কণ্ডিশন পর্যালোচনা করে টেক-ডাঊনের সফলতায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ওরা। কারণ, মেশিনগানটি এমনভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল যে, গানার খুব সহজেই ওটা দিয়ে ৩,০০০ মিটার দূরত্বে নিখুঁত নিশানা করতে পারতেন। অবস্থানটি AFO টিমের নজরে না পড়লে অপারেশন অ্যানাকোণ্ডার আগামীকাল মরণ হতে চলছিলো!
ধন্যবাদ।
Comments
Post a Comment