·
ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় বাশার আল-আসাদের হাতে সিরিয়ার মুক্তিকামী জনতার নির্যাতিত হওয়া নিয়ে আমি ইতিপূর্বে সামান্য লেখালেখি করেছি। কিছুক্ষণ পূর্বে সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের একটি বিবরণী দেখে তাই আমার সিরিয়ার এক দৃশ্যের কথা মনে পড়ে গেলো। জালেমের অত্যাচার যে সবসময় সর্বত্র একইরকম, তার একটা প্রমাণ হলো এটা।
'২৪ এর জুলাই মাসের ১৯ তারিখে BRAC University এর কাছাকাছি এলাকাতে পুলিশের গুলিতে মারুফ হুসাইন নামে একজন তরুণের প্রাণ যায়। এর কিছুক্ষণ পূর্বে সেখানে জুমার নামাজ শেষ হয়েছে। যাইহোক,খবর পেয়ে মারুফকে (মারুফের লাশ) আনতে অতঃপর তাঁর বাবা DMCH (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) এর মর্গে সেদিন সন্ধ্যাবেলায়ই হাজির হন। কিন্তু, প্রথমদিন তাঁর নিকট তাঁর ছেলেকে ফেরত দেওয়া হয়নি। মারুফ তাই পড়ে থাকলেন সেদিন মর্গের মেঝেতে।
পরের দিন মারুফের বাবা আবারও যান DMC তে। এদিন পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ওদের অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা তাঁকে প্রচণ্ডভাবে অপমান করে। তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করা হয়। নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। এরপর তারা জানায় যে, মারুফের বাবা যদি "ছেলে গুলিতে নয় বরং সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে" মর্মে কাগজে লিখিত প্রদান করেন, তাহলে তারা লাশ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে। এসবের মাঝে কেটে গেলো দ্বিতীয় দিনও। বাবা আরও একবার বাধ্য হলেন তাঁর প্রিয় সন্তানকে মর্গের মেঝেতে ফেলে রেখে চলে আসতে।
০৩য় দিন বাবা গিয়ে দেখতে পান যে, ছেলের লাশকে বেওয়ারিশের তালিকায় তুলে অদৃশ্য করে ফেলবার পরিকল্পনা হচ্ছে। অন্যদিকে অবহেলা করে ফেলে রাখায় লাশ ইতিমধ্যে রিগর মর্টিসের পর্ব পেরিয়ে গেছে। পাওয়া যাচ্ছে গন্ধ। এসব দেখে অসহায় পিতার আর্তচিৎকার, মিনতির ফলে ওরা "সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত" মর্মে লিখিত বিবৃতিতে বাবার দস্তখত নেয়। এর পরে ওরা ছেড়ে দেয় মারুফকে। মারুফকে দাফন করার কথা ছিলো বরিশালে তাঁর নিজ গ্রামের বাড়িতে। কবরও খুঁড়ে রেখেছিল পরিবার। কিন্তু, পিতাকে তারা বাধ্য করে ছেলেকে ঢাকা শহরে দাফন করতে।
অত্যাচারের ঠিক অনুরূপ বিবরণ আমরা আজ থেকে ১২ বছর পূর্বে সিরিয়ার মাটিতেও পেয়েছি।
২০১২ সালের আগস্টে সিরিয়ার দারায়া শহরে সিরিয়ান মিলিটারি ও ইরানের মিলিশিয়ারা বাশারের নির্দেশে এক ভয়ানক গণহত্যা চালায়। এসময় গণহত্যায় প্রাণ হারানো কিছু মানুষের লাশ সিরিয়ান আর্মি শহরের বাইরে এক হাসপাতালে নিয়ে বন্দি করে রাখে। তাঁদের স্বজনেরা এরপর অনেক তদবির করে আপনজনের লাশের সন্ধান বের করেন। সেখানে হাজির হওয়ার পর বাশারের শাবিহা মিলিশিয়াদের সাথে ওখানে দেখা হয়ে যায় তাঁদের। শাবিহা হলো অনেকটা আমাদের ছাত্রলীগের অনুরূপ, তবে তুলনামূলক বেশি সংগঠিত। এরা স্বজনদের লাশ ফেরত দেয় ঠিকই, কিন্তু লাশ ফেরত আনবার সময় লাশবাহী গাড়ির পেছনে মৃতদেহের সাথে আত্মীয়-পরিজনদের কয়েকজনকে বসতে বাধ্য করে। এসময় গাড়িতে Refrigerator থাকলেও ওরা তা চালু করেনি। একারণে লাশ থেকে গন্ধ বের হতে থাকে। এভাবে এই মানুষগুলো নিজ স্বজনদের লাশ দাফনের সুযোগ পান। লাশ ফিরিয়ে দেওয়ার আগে তাদের আরও বলে দেওয়া হয় যে, তারা যেন মিডিয়াকে বলেন "এসমস্ত মানুষ সন্ত্রাসীদের হাতে মারা গেছেন"।
বস্তুত, জুলুম সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে একইরকম।
Comments
Post a Comment