পহেলা আগস্ট, ২০০৫ সাল।
স্থান হা'দিসা, আল-আনবার গভর্নরেট, ইরাক। যেখানে তখন সকাল। সূর্যের আলোয় চতুর্দিক আলোকিত। যখনকার কথা এখানে লেখা হচ্ছে, এই সময়রেখাতে সমগ্র ইরাক দখল করে নিয়েছে শত্রু এবং তার দোসরেরা। তবে, এই শত্রু তখনও আনবারের অন্তর্গত হা'দিসার সকালের স্নিগ্ধতা পুরোপুরি ছিনিয়ে নিতে পারেনি। কিন্তু, সে লক্ষ্যে তখন ক্রমেই অগ্রসর হচ্ছিলো ওরা!
এরই অংশ হিসাবে ঐ দিন সকালে হা'দিসার শহরতলিতে এসে উপস্থিত হয় শত্রু বাহিনীর ০৬ সদস্য বিশিষ্ট এক বিশেষ দল। এদের পরিচয়, এরা United States Marine Corps (USMC) এর স্কাউট স্নাইপারদের টিম। স্কাউট স্নাইপারদের দায়িত্ব হলো রণক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রবেশ করা এবং প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারি করে পেছনে অবস্থানরত মেরিন রেজিমেন্ট কিংবা ডিভিশনের মূল অংশের হামলার সুবিধার জন্য শত্রুর দূর্বল স্থানকে আবিষ্কার করা। স্কাউট স্নাইপারদের এমন এলিমেন্টকে STA Team (Surveillance & Target Acquisition Team) বলা হয়। রিজিয়নাল মেরিন ফরমেশন কমাণ্ডারের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত হয় ওরা। অর্থাৎ, কোনো অঞ্চলে একটি STA Team এর উপস্থিতি সংশ্লিষ্ট রিজিয়নে নিকট ভবিষ্যতে বড় আকারের মেরিন অপারেশনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
যাইহোক, সেদিন হা'দিসায় এই গোপন দলের উপস্থিত হওয়ার খবর কোনো না কোনোভাবে শহরে অবস্থানরত আনসার আস-সুন্নাহর গেরিলা অপারেটিভদের কানে পৌঁছে যায়। সুতরাং, স্নাইপাররা শহরের বাইরে নিজেদের হাইড-আউট বানিয়ে অবজারভেশন শুরুর সাথে সাথে চতুর্দিক হতে গেরিলাদের ঘেরাওয়ে পড়ে যায়। প্রবল হামলায় STA Team এর ০৬ জনের ভেতর ০৫ জন সেখানেই মারা পড়ে। ০১ জনকে অবশ্য গেরিলারা জীবিত ধরতে সক্ষম হন। তাকে টেনে নেওয়া হয় শহরের গভীরে।
এই নির্দিষ্ট STA Element তৎকালীন সময়ে ইরাকের রামাদিতে মোতায়েন থাকা 2nd Marine Regiment কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছিল। 2nd Marines তখন আবার আনবারকে কেন্দ্র করে Operation Sword নামে বড় আকারের কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি অপারেশনে মনোযোগী ছিল। যার উদ্দেশ্য ছিলো ইরাকের আনবার গভর্নরেট থেকে ইরাকি স্বাধীনতাকামীদের সমূলে উৎখাত করে ফেলা। এর মাঝে হা'দিসাতে ওদের বিশেষ ইউনিটের এমন পরিণতির খবর ওদেরকে বেশ ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলাফল হিসাবে, ঘটনার মাত্র দু'দিন পর শহরের ওপর ১,০০০ মেরিনকে নিয়ে লঞ্চ করা হয় Operation Quick Strike!
এই লেখাটি মূলত হওয়ার কথা ছিল হা'দিসাতে এই অপারেশনের কয়েকমাস পর ঘটে যাওয়া গণহত্যাকে নিয়ে। তবে, তার আগে এই বিবরণটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে হা'দিসা সহ সমগ্র ইরাকের ওপর মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এতটা সহজ কিভাবে হয়েছে তা কিছুটা বোঝা সম্ভব হবে।
হা'দিসা ছিল মূলত সুন্নি মুসলিমদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা শহর। সাদ্দাম হুসেইন যখন ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখন ইরাকের সমস্ত শিয়া পলিটিক্যাল পার্টি, শিয়া ধর্মীয় নেতারা তেহরানের নির্দেশে বিশেষ করে ইরাকের শিয়া জনগোষ্ঠীর যুবকদের NATO এর হাতে গড়ে উঠতে থাকা নতুন ইরাকি আর্মড ফোর্সেসে যোগ দিতে আহ্বান করে (সরল ভাষায় ইরাকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার ডাক দেওয়া হয়)। এমনকি NATO এর দোসর বাহিনীর মূল অংশে পরিণত হয় তেহরান নিয়ন্ত্রিত এসব রাজনৈতিক দলগুলির সশস্ত্র শাখার সদস্যরা। অতঃপর ইরাকের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ শহরগুলোর ওপর সেনা অভিযান শুরু হলে এদেরকে মার্কিন কোয়ালিশন ময়দানে নামায়। Operation Quick Strike ও এদিক থেকে ব্যতিক্রম ছিল না। হা'দিসার ওপর অভিযান শুরু হলে USMC RCT-2 এর সাথে নবগঠিত ইরাকি আর্মিও Partner Force হিসাবে সেখানে অংশ নেয়। ইরাকি সেনাদের জন্য এই অপারেশনের কোডনেম হয় 'Operation Saif'!
সম্মিলিত বাহিনীর এই অভিযান শুরু হওয়ার মাত্র ০৪ দিনের মাথায় ভেঙে পড়ে হা'দিসার সম্পূর্ণ গেরিলা নেটওয়ার্ক। প্রাণ হারান ৪০ জন ইরাকি। এরপর থেকে শহরে মার্কিন ও তাদের দোসর ইরাকিদের সেনা টহল চলতে শুরু করে। এখন আমরা চলে যাচ্ছি এর চার মাস পর, নভেম্বরে।
সেদিনের তারিখ ছিল ১৯শে নভেম্বর, ২০০৫ সাল। মাত্র কয়েকমাস পূর্বেই গুড়িয়ে যাওয়া হা'দিসার আণ্ডারগ্রাউণ্ড গেরিলা নেটওয়ার্ক এই দিনটাতে তৎপর হয়ে ওঠার চিহ্ন প্রদর্শন করে। পরিকল্পনা অনুসারে সেদিন শহরের দিকে আসতে থাকা মেরিন লজিস্টিকস সাপ্লাই কনভয়ের প্রবেশপথে ১৫৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেল এবং বিস্ফোরক-ভর্তি প্রোপেণ ট্যাংকের সংমিশ্রণে তৈরি IED স্থাপন করে রাখেন গেরিলারা। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ভয়ানক ডিভাইসের শিকারে পরিণত হয় কনভয়ে থাকা থার্ড ব্যাটালিয়ন, ফার্স্ট মেরিনের অন্তর্গত কিলো কোম্পানির একটা স্কোয়াড!
প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ওদের একটা সাঁজোয়া যান আকাশে ছিটকে ওঠে। বিস্ফোরণের প্রবল ধাক্কায় ঘটনাস্থলে এক মেরিন প্রাণ হারায়। আচমকা এই হামলার শিকার হয়ে বাকি মেরিনরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু IED এর সমস্যা হলো, এই জিনিসের বিস্ফোরণ ঘটাতে শত্রুর দৃষ্টিসীমায় উপস্থিত থাকা জরুরি নয়। ফলে বিস্ফোরিত কনভয়ের অবশিষ্ট মেরিনরা দেখলো, তারা আঘাতের শিকার হলেও পাল্টা গুলি চালাবার জন্য সেখানে তাদের জন্য কোনো টার্গেট দাঁড়িয়ে নেই। ঠিক এই সময়ে ওরা রাস্তা ধরে একটা ট্যাক্সিকে অগ্রসর হতে দেখে!
এই ট্যাক্সিটি তখন ড্রাইভ করছিলেন আহমাদ খিজির। এবং পেছনে তাঁর সাথে ছিলেন আকরাম হামিদ ফালায়েহ, খালিদ আয়াদা আল-জাওয়ি, ওয়াজদি আয়াদা আল-জাওয়ি এবং মুহাম্মাদ বাত্তাল মাহমুদ। এরা সবাই ছিলেন শহরের সাধারণ স্থানীয় নাগরিক। সেসময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা Kilo Company এর স্টাফ সার্জেন্ট ফ্র্যাংক উঁটেরিখের নেতৃত্বে মেরিনরা এই গাড়িকে থামার আদেশ দেয়। এরপর জোরপূর্বক গাড়ির যাত্রীদের নেমে আসবার নির্দেশ প্রদান করা হয়। যাত্রীরা নেমে আসামাত্র তাঁদের প্রত্যেককে বুকে ও মাথায় গুলি চালিয়ে USMC এর সদস্যরা হত্যা করে!
এর সামান্য সময় পর লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম ক্যালোপের নেতৃত্বে সেখানে প্রবেশ করে মেরিন রি-ইনফোর্সমেন্ট এলিমেন্ট। নবাগত এই লেফটেন্যান্টের নির্দেশে মেরিনের দল এসময় আশপাশের বাড়ির দরজা ভাঙতে শুরু করে। দরজা ভেঙে ওরা সাধারণ মানুষে পরিপূর্ণ এসব বাড়ির ভেতরে গ্রেনেড ছুঁড়তে আরম্ভ করে। এরপর স্কোয়াড অটোমেটিক ওয়েপন (SAW) তথা লাইট মেশিনগান দিয়ে প্রত্যেকটি রূমে বুলেট স্প্রে করা শুরু হয়। বাড়িগুলোর একটিতে তখন উপস্থিত ছিলেন ০৯ বছর বয়সী ইমান ওয়ালিদ। তাঁর ভাষ্যমতে -
"আমি ভালোভাবে ওদের চেহারা দেখতে পাইনি। আমি শুধু দরজা দিয়ে ওদের রাইফেলের নল বের হয়ে আসতে দেখি। আমি দেখলাম, ওরা প্রথমে আমার দাদুকে গুলি করলো। প্রথমে বুকে, তারপর মাথায়! এরপর ওরা আমার দাদিকে হত্যা করে!"
ভয়াবহ এই গণহত্যার শেষে আমেরিকান মেরিনরা এই হত্যাকাণ্ডকে কাভার-আপ করবারও চেষ্টা চালায়৷ এই প্রচেষ্টার ব্যাপারে হা'দিসার স্থানীয় হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার আব্দুল ওয়াহিদ বলেন -
"উনিশ তারিখ রাতের আঁধারে দু'টি আমেরিকান হামভিতে (আর্মার্ড কার) করে আমার হাসপাতালে ২৪ জন মানুষের লাশ আনা হয়। মেরিনরা সেসময় দাবি করে যে, তাঁদের ভেতর প্রাণ হারানো নারী ও শিশুরা সন্ত্রাসীদের রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা বোমায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবং পুরুষেরা ছিলো নাশকতামূলক কাজে জড়িত। কিন্তু, হাসপাতালের চিকিৎসকরা কোনো লাশের ভেতরে বোমার শ্র্যাপনেল পান নাই। বরং, দেখে পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল যে, এই মানুষদের খুব কাছ থেকে বুকে ও মাথায় গুলি চালিয়ে খুন করা হয়েছে!"
এই ভয়ানক অত্যাচারে প্রাণ হারানো মানুষদের ভেতর ১৫ জনের পরিবারকে United States Marine Corps এর তরফ হতে ৩৮,০০০ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। নির্বিচারে অন্যায়ভাবে হত্যার শিকার মানুষদের প্রাণের মূল্য মাত্র ৩৮,০০০ ডলার নির্ধারণ করে ওরা! আর তা পরিশোধ করেই ওরা নিজেদের পৃথিবীতে দায়মুক্ত করে নেয়।
শেষকথা:
আমরা যখন ইরাক ও সিরিয়াতে মার্কিন কিংবা রূশ আগ্রাসনের কথা বলি, তখন আমরা পরিস্থিতির দায় সম্পূর্ণরূপে ওসব বিদেশি শক্তির ওপরই চাপিয়ে দেই। অথচ, ওদের স্থানীয় দোসর, যাদের সহযোগিতা ব্যতিরেকে ওরা এসব তাণ্ডবের অর্ধেকও সফলভাবে চালাতে পারতো না, বৈধতা দিতে পারতো না নিজেদের অন্যায় কাজকে, ওসব দোসরের দিকে আমরা আঙ্গুল তুলতে ভুলে যাই। এমনকি সেখানেও শেষ নয় বিষয়টি। বরং, কালক্রমে আমরা এই দোসরগুলোর মিথ্যাচারকে বিশ্বাস করে ওদেরকে নায়কের মসনদে তুলে দিয়েছি আজ! অথচ, ইরাকে ইরাকিদের ওপর আমেরিকানদের অত্যাচারের বড় সহায়তাকারী এরা। এমনকি হয়তো দেখা যাবে, খোদ আমেরিকানদের থেকেও বেশি অত্যাচার এরা নিজেরাই করেছে বা করে যাচ্ছে দেশটিতে।
মহাসাগরের ওপার থেকে আসা আমেরিকানরা, যারা কোনোরকম আরবিও বলতে পারে না, ওরা কিভাবে এতো নিঁখুতভাবে শহরে শহরে গেরিলাদের দমন করেছে? ইনফরমেশন দিয়েছে কে? এসব দোসরেরা। আর, আমেরিকানরা তো এসে মেরে চলে যেতো। তারপর আমেরিকান সেনার ভয় দেখিয়ে জনগণকে শোষণও এরাই করতো। আর এখন তো সবকিছু ওখানে ওদেরই হাতে চলে গেছে। পৃথিবীর অবুঝরাও আবার ইদানীং ওদের নায়ক হিসাবে সম্মান করে। মন্দ কি!
ধন্যবাদ।
Comments
Post a Comment