১৯৭১ সালের বিহারী গণহত্যার জন্য বাঙালিদের দায়ী করা হয়। তাঁদের ক্ষমা চাইতে বলা হয়। এখানে আমার মতামত রয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালে বিহারী ও বাঙালি, উভয় গণহত্যার জন্য Pakistan Army 'কে ক্ষমা চাইতে হবে। প্রথমত, বিহারীদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে, কারণ, তাঁদেরকে ওরা সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আপনি একটু অনুসন্ধান করলে দেখবেন যে, ২৫শে মার্চের পূর্বেকার সময়ে যতগুলো আক্রমণ হয়েছে বিহারীদের ওপর, ওগুলো সাধারণ মানুষ করেনি। ওগুলো করেছিল সংগ্রাম পরিষদ ইত্যাদির সাথে যুক্ত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সুনির্দিষ্ট কিছু সদস্যরা।
বিভিন্ন স্থানে আলোচ্য ব্যক্তিত্বরা আবার লোকসমাগম করে বাঙালি বনাম বিহারী পরিস্থিতি গড়ে তুলছিল। যা অনেক স্থানে তারপর জাতিগত সংঘাতে রূপ নিচ্ছিল।
আলোচ্য পরিস্থিতির কিন্তু অতি সহজেই প্রতিকার করা সম্ভব হতো। যদি পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ও রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিত্বরা এটিকে বাঙালির নিমকহারামি হিসাবে না দেখে একটি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার ফলাফল হিসাবে চিহ্নিত করতো। অতঃপর, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতো। কারণ, বিহারীদের প্রতি সাধারণ বাঙালির এমন কোনো বিদ্বেষ নাই যে, তারা জাতিগতভাবে একদিন সকালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, "আজ সকালে কয়েকটা বিহারী শেষ করতে হবে!"
কিন্তু, ওরা এটিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা না করে, সরাসরি শত্রু জাতির তৎপরতা হিসাবে চিহ্নিত করলো। তারপর বিহারীদের পক্ষ নেওয়ার নাম করে বাঙালির ওপর নৃশংসভাবে হামলে পড়লো। তারপর কি হবে বলে আপনার মনে হয়?
এতদিন যাবত বিহারীদের ওপর সাধারণ বাঙালির কোনো প্রতিহিংসা ছিল না। কিন্তু, এখন বিহারীর পক্ষ নিয়ে নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করা হয়েছে। East Bengal Regimental Centre (EBRC) 'তে কিশোর ও তরুণ রিক্রুটদের বাঙালি বলে হত্যার সংবাদ বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন সমস্ত বাঙালি ইঊনিটে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঙালি সামরিক ইঊনিটগুলো স্বয়ং নানান জায়গাতে আক্রান্ত হচ্ছে!
এখন এটা আর গুটিকয়েক বিপথগামী ব্যক্তিত্বের মাঝে সীমাবদ্ধ নাই। পাকিস্তান আর্মির গণহত্যা এখন বিহারীদের সরাসরি জাতিগতভাবে বাঙালির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন যুদ্ধ বাঙালি জাতির বিপক্ষে। আর এখানেই আসে বাঙালির নিকট ক্ষমাপ্রার্থনার প্রশ্ন। পাকিস্তানের সামরিক সরকার নির্দিষ্ট একটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে বিদেশি শক্তির তৎপরতা হতে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়ে আরেকটি জাতির ওপর হামলে পড়েছিল। এবং দুই জাতিকে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। এজন্য ওদেরকে উভয়ের নিকট করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে।
এরপর আগে বাংলাদেশিদের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন। আমাদের বিজয়ের মূহুর্ত কিন্তু জাতিগত প্রতিহিংসার কালিতে লেপ্টে গিয়েছে। বিহারীদের ওপর আমাদের বিজয়ের আগে ও পরে আমাদের নামে গণহত্যা হয়েছে। পাকিস্তান আর্মির সাথে এখানে আমাদের পার্থক্য ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কেন হয়নি বা কেন সম্ভব ছিল না, কারা ঘটিয়েছে সেটি আরেকটি স্পর্শকাতর আলাপ। সেদিকে না যাওয়া। কিন্তু, বিজয়ী হিসাবে আমাদের যে নৈতিক অবস্থান রাখা উচিত ছিল, তা আমরা ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। সেজন্য আমাদের উচিত দূঃখিত হওয়া। ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
সবশেষে, পাকিস্তানের সরকার সামরিক সরকার হওয়ার কারণে এই সমগ্র পরিস্থিতি তৈরি করা সহজ হয়েছে।
ধন্যবাদ।
Comments
Post a Comment