(সুদীর্ঘ লেখা। অতএব, হাতে সময় নিয়ে পড়ার অনুরোধ রাখা হলো)
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হলো, আমরা চতুর্দিক হতে একটি প্রত্যক্ষ শত্রুর অদৃশ্য ঘেরাওয়ের মাঝে রয়েছি। চতুর্দিক, কারণ বঙ্গোপসাগরকে আমরা অনেকে ঝাপ দেওয়ার স্থান মনে করি, আসলে ওটাও শত্রু নৌ-বাহিনীর সাগর। সংঘাত বা সামরিক চাপ (অবরোধ) আরম্ভ হলে ওখানে আমাদের চলাচলের স্বাধীনতা অর্থাৎ Freedom of Navigation বজায় রাখা আমাদের শত্রুর সামর্থ্য অনুসারে বাংলাদেশের বর্তমান নৌ ও বিমান শক্তির নাই। যেখানে গাজার সৌভাগ্যবান অধিবাসীদের মাধ্যমে আমরা জানি যে, সাগরে শত্রু নৌ-সেনার আধিপত্য থাকলে সাগর হয় মৃত্যুফাঁদ।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইণ্ডিয়া বাংলাদেশে আগ্রাসন পরিচালনা করবে কিনা, এটা বর্তমানে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের দৃষ্টিকোণ হতে বাতিল হয়ে যাওয়া একটি প্রশ্ন। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের নতুন এবং বাস্তবমুখী যে প্রশ্নটি হওয়া উচিত, সেটি হলো, ইণ্ডিয়া আমাদের দেশে কবে আগ্রাসন চালাবে, কিভাবে চালাবে এবং তার বিপরীতে আমাদের পদক্ষেপ কি হতে পারে! আর ঠিক এখানে এসে বাংলাদেশিরা অনেক বেশি পরিমাণে ইণ্ডিয়াকে ছাড় দিয়ে থাকেন। "ইণ্ডিয়া আগ্রাসন চালাতে পারে না, ইণ্ডিয়ার অমন পদক্ষেপ ঠিক অমুক কারণে বোকামি, আর এই কারণে ঐ পদক্ষেপ নেওয়া হবে না" জাতীয় কথা আমরা তখন আমাদের মাঝখান হতে শুনতে পাই। যাকে "Mirror Imaging, Strategic Narcissism" এর মতো নানান কথায় ব্যাখ্যা করা যায়। Department of Political Science, Columbia University এর Professor Robert Jervis এর কথা অনুসারে, Mirror Imaging হলো "The Original Sin of Intelligence Analysis"৷ যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে, আমার শত্রুর চিন্তাধারা আমার চিন্তাধারার অনুরূপ এবং ওদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা সেখানে কোনো অবদান রাখে না। ফলে, আমার পরবর্তী সকল Doctrine, Strategy, Tactics সহ সমস্ত কিছু চলে একদিকে, ওদিকে শত্রু আচমকা আসে পুরোপুরি বিপরীত সিলেবাস নিয়ে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও বর্তমানে নিজেদের অবচেতন মনে আলোচ্য সম্ভাবনাময় বাস্তবতা সম্পর্কে জানেন। যার ফলে আমরা বর্তমান সময়ে নিয়মিত জনতার মাঝে আমাদের Deterrence নিয়ে আলাপ শুনতে পাই। যেখানে বাস্তবতা সম্পর্কে অবগতির স্বল্পতার কারণে আমাদের অধিকাংশের চিন্তার শেষ গন্তব্য হয় পাকিস্তানের সাথে কোনো ধরণের চুক্তি অথবা কোনোরকমে নিজেদের জন্য একটি পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ। আমাদের ধারণা হলো, দু'টির কোনো একটি হয়ে গেলে আমাদের আর কোনো শঙ্কার কারণ থাকছে না। অথচ, ধারণাগুলি স্বয়ং নিজেরা চরম অবাস্তব। কেন, তা আশা করি ভেঙে না বললেও বোঝা কষ্টকর নয়।
তবে, আমাদের জন্য আরেকটি পথে Deterrence অর্জন করা খুবই সম্ভব। যে পথে গেলে পরমাণু অস্ত্রের ন্যায় জটিলতায় পূর্ণ বস্তুর দিকে যেমন আমাদের হাত বাড়াবার দরকার নাই, তেমনি পাকিস্তানের মতো অনির্ভরযোগ্য ও রাজনৈতিক এবং নৈতিকভাবে ভঙ্গুর আঞ্চলিক শক্তির ওপরেও এককভাবে আস্থা রাখবার দরকার নাই। যে পথটি পুরোপুরি বাস্তবসম্মত। যেখানে আন্তর্জাতিক কোনো চাপের বৈধতাও তৈরি করা আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব নয়। তবে, সেদিকে যাওয়ার পূর্বে সবার আগে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে Deterrence সম্পর্কে জানব।
U.S. Department of War এর সংজ্ঞা অনুযায়ী Deterrence হলো, "The prevention from action by fear of the consequences"।
আবার Army War College এর শিক্ষা অনুসারে Deterrence হলো ঐ বস্তু, যার দ্বারা "চরম ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা, অথবা পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করার পরেও লক্ষ্যবস্তু অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ার শক্তিশালী শঙ্কার কারণ গড়ে তোলার দ্বারা শত্রুকে শত্রুর নিজস্ব পদক্ষেপে অনুৎসাহিত করা সম্ভব।" এক্ষেত্রে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো ওপরের দ্বিতীয় বিষয়টি। যাকে Deterrence by Denial নামে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আর্মি ওয়ার কলেজের ভাষায়, "Deterrence by denial seeks to avert an action by convincing the actor that he cannot achieve his purpose"।
যদিও Conventional deterrence কতখানি কার্যকর তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে, আলোচ্য ধারণাটি স্রেফ Deterrence এ সীমাবদ্ধ নয়। বরং, স্বাভাবিক কারণেই এর বাহিরেও এখানে অসংখ্য সুফল বিদ্যমান। যেমন, Conventional deterrence কোথাও ব্যর্থ হলেও সেখানে deterrence বজায় রাখার স্বার্থে চালু থাকা নানান বাহিনী কেন্দ্রিক সংস্কৃতি সরাসরি সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়ে থাকলে শত্রুকে "ওদের আগ্রাসী পদক্ষেপটি কেন নেওয়া উচিত ছিল না", তা বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকরী অবদান রাখতে পারে।
Bangladesh Rifles (BDR)। যাদের উত্তরসূরীরা আজ Border Guard Bangladesh নামে পরিচিত। তারা আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হতে পারেন আমাদের দিক হতে Deterrence Factor। যা কিনা আমরা বর্তমানে অনেকটা অবুঝের ন্যায় পরমাণু অস্ত্রের মতো বস্তুর মাঝে সন্ধান করছি। তবে, আলোচ্য বাহিনীকে বিপরীতে ঐ পর্যায়ে উন্নীত করতে হলে তার জন্য সেখানে ও তার চতুর্দিকের সামরিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাঝে চূড়ান্ত মাত্রার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আরম্ভের দরকার হবে।
"Rifles of The East"
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমাদের কোনো সীমান্ত "রক্ষী" বাহিনীর দরকার নাই। আমাদের বাস্তবতা হলো, আমরা ০৪ দিক হতে শত্রুর ঘেরাওয়ে আবদ্ধ একটি ভূখণ্ড। যেখানে সড়কপথের চরম উন্নতি, নদ-নদী, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ার ফলে আমাদের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর কোনো আচানক শত্রু আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে প্রস্তুতিমূলক পর্বের যো সময়সীমা, তা অনেকখানি সীমিত হয়ে এসেছে। যার বিপরীতে একটি পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসী শক্তি ওদের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের First Line of Defence কে ভেদ করে দ্রুততার সাথে দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ Supply Route ও Critical Infrastructure এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেললে সেখানে কারো অবাক হওয়ার কিছু থাকছে না। সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার এমন একটি বাহিনী, যারা প্রশিক্ষণ এবং মানসিকতার দিক থেকে Expeditionary হবেন। সীমান্তকে যে বাহিনী সীমান্ত নয়, বরং সার্বক্ষণিক FLOT (Forward Line of Own Troops) হিসাবে বিবেচনা করবেন। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, এখানে সরাসরি প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তকে FLOT এর মতো কঠোর ভাষা দ্বারা চিহ্নিত করার কথা বলা হচ্ছে। বরং, এটি সমগ্র বাহিনীর সাংগঠনিক মানসিকতার মাঝে আমূল গেঁথে থাকা জরুরি যে, আন্তর্জাতিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও, আমাদের জন্য পরিবেশ সার্বক্ষণিক যুদ্ধের। যেখানে শত্রুর আক্রমণ যেকোনো সময়, ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ যেকোনো আকারে, যেকোনো দিক হতে সংঘটিত হতে পারে।
আজকের দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে আলোচনাটি হয়তো চরম অযৌক্তিক ও অনেকের নিকট অস্বাভাবিক মনে হয়ে থাকবে। কারণ, এই পথের Mandate পূর্ণ করতে শুরু করলে Border Guard Bangladesh আর "Guard" থাকবে না। এটি তখন পূর্ণমাত্রার অভিজাত "Expeditionary" বাহিনীতে রূপান্তর লাভ করবে। যাদের দক্ষতা, অপারেশনাল পর্যায়ের হালকা সামরিক সরঞ্জামের মান ও সাংগঠনিক কার্যক্ষমতা কমপক্ষে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সমান হবে। অথবা তাদের ছাড়িয়ে যাবে। ফলে, বিষয়টি খুবই অদ্ভুত মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু, ইতিহাসের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি, পূর্বেকার সময়ে সীমান্ত কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম প্রশিক্ষিত, দূর্বল বাহিনী দ্বারা অনেক সময়ই নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। প্রাচীন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে ওরা Expeditionary Capable অভিজাত বাহিনীকে নিয়মিতভাবে সীমান্তের প্রতিরক্ষায় নিয়োগ করতো। কারণ, মুসলিম বাহিনীর ও তার পূর্বে অন্যান্য শক্তির আক্রমণের শিকার হতে হতে ওদের Strategic Depth অনেকাংশে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। ফলে, সীমান্ত অঞ্চল ওদের জন্য ছিল Forward Edge of the Battle Area (FEBA)। যেখানে মূল সীমান্ত ছিল ওদের জন্য FLOT। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাইজেন্টাইনদের অনুরূপ আমাদেরও কিন্তু Strategic Depth একেবারেই নাই। সেক্ষেত্রে আধুনিক যুগের প্রচলিত Layered Defence এর কৌশল আমাদের জন্য একেবারেই অপ্রযোজ্য। বাইজেন্টাইনদের বিপরীতে আবার রোম সাম্রাজ্যের সামরিক কৌশলে সীমান্তরক্ষীরা ছিল নিয়মিত বাহিনীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত দূর্বল আকৃতি ও গড়নের। কারণ, রোম সাম্রাজ্যের Strategic Depth বিস্তীর্ণ হওয়ার কারণে ওদের Legion গুলোর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সেনাদের ন্যায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল না। ফলে, ওরা সীমান্তের অনেক পেছনে মূল সাম্রাজ্যের গভীরের ঘাঁটিতে অবস্থান করতো। আর, সীমান্তে মোতায়েন রাখা হতো অপেক্ষাকৃত দূর্বল সীমান্তরক্ষীদের।
"East Bengal Rifles"
আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামরিক নীতিনির্ধারকদের উচিত আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে কেন্দ্র করে বাইজেন্টাইনদের অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারণ, আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে আমরা নতুন করে একটি Expeditionary Capable বাহিনী দাঁড় করাতে গেলে সেখানে নানান অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ঝামেলার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, অনুরূপ বাহিনী সরাসরি সামরিক বাহিনীর সংজ্ঞার মাঝে চলে যায়। যাদের সীমান্তে মোতায়েন করা হলে তা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে ও যার দায় বাংলাদেশের কাঁধে পতিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা বিদ্যমান। আবার, বর্তমান সামরিক বাহিনীকে সীমান্তে মোতায়েন করলে সেখানেও পূর্বেকার পরিস্থিতি ঘটার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ, বর্তমান পরিস্থিতি অনুসারে বাস্তবতা হলো নিম্নরূপ।
"The less strategic depth a nation has, the more expeditionary it's border guards must be!"
সেক্ষেত্রে, আমাদের করণীয় হলো, Bangladesh Rifles কে ফিরিয়ে আনা। আসলে বলা উচিত, Bangladesh Rifles এর যে Concept ছিল, তা ফিরিয়ে আনা। যে কারণে Bangladesh Rifles এর ইঊনিটের কমাণ্ড সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা নিতেন, সেই কারণটিতে ফিরে যাওয়া এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে মাদক পাচার, মানব পাচার, চোরাচালানের মতো বিবিধ অপরাধ দমনকারী বাহিনী হতে আমাদের ভূখণ্ডের সত্যিকার ডিফেণ্ডারে রূপান্তর করা।
এক্ষেত্রে আমাদের Doctrine ও Strategy বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও ঊমাইয়া খিলাফতের অবলম্বিত কৌশল দ্বয়ের মিশ্রণ হতে পারে। যেখানে আমাদের সীমান্তের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী সীমান্তকে Forward Line of Own Troops (FLOT) হিসাবে বিবেচনা করা হবে। যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ের স্বাভাবিক তৎপরতা থাকবে। কিন্তু, সেখান হতে সুনির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত অঞ্চলকে আমাদের সীমান্তের বাহিনীর জন্য প্রতিরক্ষা অঞ্চল হিসাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। যার সর্ব-সম্মুখ প্রান্তর আমাদের জন্য Forward Edge of The Battle Area (FEBA) হিসাবে বিবেচিত হবে। অবশ্যই যা হবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। Operational পর্যায়ে আসলে যেখানে ধারণাটির স্রেফ অস্তিত্বের উপস্থিতি প্রকট আকারে অনুভূত হবে।
খিলাফতে রাশেদার সময়ে মুসলিমদের কোনো স্থিতিশীল সীমান্ত বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। Forward Expeditionary Army তাঁদের ক্যাম্পেইনের বিরতি চলাকালীন সীমান্তে অবস্থান করতেন ও নতুন অভিযানের আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে নিজেদের সাথে সাথে সীমান্তকেও নিয়ে এগিয়ে চলতেন। খিলাফতে ঊমাইয়ার সময়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমান্ত কিছুটা স্থির আকার পায়। যদিও, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন দু'টি আর্মি সার্বক্ষণিক সীমান্তে সামরিক অভিযান চালিয়েই যেতো। তবে, তাঁদের পেছনে সীমান্তের একটা স্থির আকার ছিল।
আর ঐ সীমান্তে যেসব মুসলিম বসবাস করতেন, আর যেসকল যোদ্ধা ইসলামি সীমান্তের প্রহরার জন্য গমন করতেন, তাঁদের বলা হতো الْمُرَابِطُونَ (মুরাবিতুন)। আর তাঁদের পরিচালিত তৎপরতাকে বলা হতো رِبَاط। এক্ষেত্রে স্থানীয় মুরাবিতুন যারা ছিলেন, তাঁদের মাধ্যমে সীমান্তের দু'পাশে প্রচণ্ড শক্তিশালী গুপ্তচর তৎপরতা পরিচালিত হতো। তাঁরা সমগ্র সীমান্ত অঞ্চলে খিলাফতের সামরিক বাহিনী ও কেন্দ্রের পক্ষ হতে শত্রুর তৎপরতার বিরুদ্ধে ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের বিস্তীর্ণ জাল ছড়িয়ে রেখেছিলেন। ফলে, কোথায় কোন শত্রু বাহিনীর কোন সৈনিক কোন মুসলিম নারীকে কি বলে অপমান করেছে, তার রিপোর্ট দামেশক (পরবর্তীতে বাগদাদ) পর্যন্ত পৌঁছাতে সময়ের দরকার হতো না। আর রিপোর্ট পৌঁছানোর সাথে সাথে মৌসুমের বার্তাবাহী সেনাদের গতিপথ পরিবর্তন হতো, তাঁদের গতি ঝড়ো আকার ধারণ করতো। এই মুরাবিতুনদের দ্বারা স্থানীয় জনগণের মাঝে খিলাফতের সেনাবাহিনীর প্রতি ভালোবাসা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সহযোগিতার মানসিকতাও তৈরি করা হতো। ফলে, সমগ্র জনপদ, বেসামরিক হলেও আদতে একেকটি সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা অঞ্চলের রূপলাভ করতো।
আমাদের সীমান্তের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর গোয়েন্দা শাখাকে অনুরূপ সক্ষমতা আর বিস্তৃতি দান করা এই Concept এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবি। প্রথম চাবি হলো, সীমান্তের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর নিয়মিত অংশকে অভিজাত, Expeditionary Capable Light Infantry 'তে রূপান্তর করা। যারা Light Armoured Vehicles ও সাধারণ দ্রুতগামী যানে সজ্জিত হবেন। আকাশে যাদের নিজস্ব Intelligence, Surveillance, Reconnaissance (ISR) প্লাটফর্ম থাকবে। আরো থাকবে নিজস্ব Unmanned Aerial Vehicle (UAV) অপারেটরদের ফর্মেশন। যারা তাদের প্রকারভেদ অনুসারে প্রতিটি সুনির্দিষ্ট আকৃতির ইঊনিটের সাথে সংযুক্ত থাকবেন। Anti-Tank Weapons System বাহিনীর Section পর্যায়ে যুক্ত করতে হবে। এবং Anti-Aircraft System ও যথাশীঘ্রি বাহিনীর মাঝে যথাযোগ্য প্রশিক্ষণের সাথে ছড়িয়ে দেওয়ার দরকার হবে। মাঊন্টেড সেকশনের জন্য Automatic Grenade Launcher বরাদ্দ করা এবং Platoon পর্যায়ে মর্টার সিস্টেম ইস্যু করার গুরুত্ব দেখা দিতে পারে। আসলে, অনুরূপ আরো নানান পরামর্শ এখান হতে দেওয়া সম্ভব। তবে, বাস্তবতা অনুযায়ী ফিল্ডে যারা রয়েছেন, তাঁরা কাজ করলেই বরং সর্বোত্তম ফলাফল আসার সম্ভাবনা বেশি।
এটি ছিল Conventional Force এর কথা। এই বাহিনীর একটি Unconventional Warfare শাখা থাকা জরুরি। যারা মূলত বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা ও Special Operations শাখার সমন্বয়ে গড়ে উঠবেন। তাঁদের দায়িত্ব হতে পারে সমগ্র সীমান্ত অঞ্চলে Central Intelligence Agency (CIA) এর অনুকরণে Operation Gladio এর অনুরূপ Stay Behind Teams (SBT) এর নেটওয়ার্ক তৈরি করা। যারা সীমান্তের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলে সীমান্ত অঞ্চল হতে শুরু করে শত্রুর দখলকৃত সকল অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণকে গেরিলা তৎপরতার প্রশিক্ষণ দিবেন। এমনকি শত্রুসীমার অভ্যন্তরেও তাঁদের যথাসম্ভব শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকবে। এই বাহিনী সীমান্তের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে তাঁদের উপরোক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি শান্তিকালীন সময়ে সীমান্ত অঞ্চলে Cross-border অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন। যার দ্বারা তাঁরা সীমান্তের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবেন।
আলোচ্য বাহিনীকে দেশের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে কখনো কোনো কারণেই মোতায়েন করা যাবে না। সীমান্ত অঞ্চল ও সীমান্ত হতে সুনির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে তাদের এখতিয়ার দিতে হবে। তবে, সেখানেও তাঁরা সীমান্তের নিরাপত্তা ও নিজেদের জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে সকল ধরনের আইন-শৃঙ্খলা তৎপরতা পরিচালনা হতে বিরত থাকবেন। সাধারণত এগুলো স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বে থাকবে। তবে, তাদের অধিকার দিতে হবে যে, সীমান্তে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর তারা নিজেদের অধিকারভুক্ত অঞ্চলে যেকোনো আইনসিদ্ধ তৎপরতা পরিচালনা করতে পারবেন। যেখানে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহাররোধ করার জন্য তাদের Morale এর ক্ষতি করে না এমন বিভিন্ন বাস্তবিক Safety System চালু করা হবে।
সামরিক বাহিনী হতে আলোচ্য বাহিনীতে দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের প্রেরণ করা যেতে পারে। দেশের অন্যান্য সকল বাহিনী ও সংস্থায় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রেরণ করার পরিবর্তে শুধুমাত্র এখানে তাদের পাঠানো হবে। যদি তারা বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি বিশেষ বাছাই ও প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হন। সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে যা বিবেচনা করতে হবে তা হলো, দেশের প্রতিরক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাহিনীর মাঝে অন্যতম একটিতে যাদের (সৈনিক ও কর্মকর্তা) নেওয়া হবে, তাদের সাথে যেন কোনোভাবে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের কোনো সংযোগ না থাকে। আর, কর্মকর্তাগণ বাহিনীতে সুদীর্ঘ সময়ের জন্য আসবেন। ও তাঁদের মাতৃ বাহিনীতে বিশেষ মর্যাদার সাথে দেখা হবে।
সর্বোপরি, আমাদের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের পক্ষে সীমান্তে একটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কৃতিতে পরিচালিত কোনো বাহিনীকে রাখবার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়। ফলে, আমরা যেন সেদিকে কোনোক্রমে চলে না যাই, সেদিকে সবার আগে গুরুত্ব প্রদান করা জরুরি। তারপর আমাদেরকে নিজেদের সীমান্তের প্রতিরক্ষা বিস্তৃত করবার দরকার হবে।
ধন্যবাদ।
(এটি আমার ব্যক্তিগত ধারণা ও মতামতের প্রতিফলন। ভুল হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করা হলো)
Comments
Post a Comment