১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর CIA একটা রিপোর্ট তৈরি করে। যার শিরোনাম ছিলো "Indian Military Capabilities for Intervention in Bangladesh"। রিপোর্টটা মার্কিন ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (DIA) রিভিউ করে। যেখানে বাংলাদেশের ওপর একটা সম্ভাব্য ভারতীয় সামরিক আগ্রাসনের চিত্র অঙ্কিত হয়।
রিপোর্টটা আজ থেকে ৪৮ বছর আগের। কিন্তু, এর বিষয়বস্তু আজ ৪৮ বছর পর অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন ঐ রিপোর্টে ভারতের পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। তবে, বিশেষ কিছু কথা সেখান থেকে এখানে তুলে আনা হবে। যেমন, CIA এর বিশ্লেষক বলছেন -
"India could readily commit ground forces of over 150,000 men. Without significantly weakening it's defense against China & Pakistan. Against Bangladesh Ground Forces of no more than 87,000 men who are already partially demoralized."
এখানে বলা হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দেড় লক্ষ সেনার সমপরিমাণ শক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং চীনের বিরুদ্ধে ওদের প্রতিরক্ষায় তেমন চাপ সৃষ্টি হবে না। তবে এখানে বাংলাদেশ আর্মির যে সেনা শক্তির কথা উল্লেখিত হয়েছে, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুন হয়েছে বলে আমরা ধারণা করি।
কিন্তু আমাদের সামরিক শক্তি যদিও জনবলের দিক থেকে বর্তমানে দ্বিগুন হয়েছে, তারপরও দূঃখজনকভাবে উক্ত রিপোর্টের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা কোনোভাবে কমে যায়নি। এর কারণ হলো, রিপোর্টটি যখন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিস্টরা লিখছিলেন, তখন এদেশের মানুষের মাঝে ইণ্ডিয়ার বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা জাগ্রত হতে শুরু করেছিল। কিন্তু, বিপরীতে ইণ্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি তখনও সে ঘৃণার সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো কার্যকর নেটওয়ার্ক এদেশের মাটিতে খাড়া করে তুলতে পেরেছিল না।
এখন সময় বদলেছে। ভারতীয় গুপ্তচরেরা ৪৮ বছর পর আজ এদেশে এমন নিখুঁত একটা নেটওয়ার্ক খাড়া করেছে, যার তুলনা পৃথিবীতে মেলা ভার। আর এই নেটওয়ার্ক যে শুধুমাত্র সদ্য ক্ষমতা হারানো রাজনৈতিক দলের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো তা কিন্তু নয়। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে 'র' এর সিনিয়র অফিসার ছিলেন মিস্টার মহাপাত্র নামের এক ব্যক্তি। মহাপাত্র বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাসের উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাভার ব্যবহার করতেন। তার সাথে ছিলেন তার স্ত্রী। যিনি নিজেও Tradecraft এর আর্টে বেশ সুদক্ষ। যে আর্টের একটা অংশ ছিল তার নাচ। তিনি কথক নাচে বেশ ভালো পারদর্শী ছিলেন। দেশের ক্ষমতা তখন BNP এর হাতে।
যাইহোক, মহাপাত্র ইণ্ডিয়ান হাইকমিশনের মাধ্যমে ঢাকায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করলেন। যেখানে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ থাকতেন তার অর্ধাঙ্গিনী নিজে। আমন্ত্রণ পেয়ে এই নির্দোষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত হাজির হতেন ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী, পার্লামেন্ট মেম্বার, নাট্যশিল্পী, বুদ্ধিজীবি, কলামিস্টদের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। আর মিস্টার মহাপাত্র তাদের মাঝে উপযুক্ত ব্যক্তিদের ওখানে বসে বাছাই করে নিতেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনগুলো কি হয়ে যাচ্ছে অনুধাবন করে সরকারি নেতাদের এসব অনুষ্ঠানে গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু, ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। BNP এর তৎকালীন সিনিয়র দু'জন মিনিস্টারের সাথে মিস্টার মহাপাত্রের গলায় গলায় ভাবের ব্যাপারটা সেসময় গুপ্তচর মহলে Open Secret ছিল বলে শোনা যায়।
এই ঘটনাটি যে বই থেকে নেওয়া হয়েছে, তার লেখক খানিকটা দূরে গিয়ে তৎকালীন বাংলাদেশি ইন্টেলিজেন্সের সূত্রে আরেকটি কথা লিখেছেন। যার সারমর্ম হলো, '৯০ দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তর হতে ইণ্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তাদের অনুগত লোক Recruit করতে সমর্থ হয়। এটা নিয়ে এখানে আপাতত দীর্ঘ আলোচনায় যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাহলে লেখা অন্যদিকে গড়াবে। এসব তথ্য বলার মূল উদ্দেশ্য, দেশের ভেতরে ওদের অনুপ্রবেশ কতটা গভীর তা আমাদের এখানে অনুধাবন করতে পারাটা। ফিরে যাই মূল প্রসঙ্গে।
ভারতকে প্রাথমিক পর্যায়ে এদেশের মাটিতে সেনা মোতায়েনের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। '৯০ এর দশক থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত যে তিন দশক সময় মাঝে অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে ওরা একটা সুপ্ত বিশৃঙ্খল শক্তি আমাদের মাঝে প্রস্তুত করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। এই শক্তির বাংলাদেশ দখলের ক্ষমতা নাই। কিন্তু এদের ভারতের আগমনের রাস্তা তৈরির জন্য দরকারি পরিমাণ রক্তপাত ঘটানোর সক্ষমতা আছে। এবং ওরা আগ্রাসন শুরু করলে ওদের সমর্থনের জন্য লোকাল মিলিশিয়া হিসাবে জনবল সাপ্লাইয়ের কাজটাও এরা দক্ষতার সঙ্গে চালাবে। যেমন রাশিয়া ইউক্রেনে করছে দনেতস্ক ও লুহানস্কের Separatist দের নিয়ে। একইসাথে, CIA রিপোর্টে আমাদের সেনাবাহিনীকে "Demoralized Army" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটাকেও আপাতত বাস্তবতা বলে ধরে রাখতে হবে।
"India would establish full control over the Government of Bangladesh & all urban & administrative centers within a maximum of Two weeks. Probably much sooner."
মার্কিন গোয়েন্দারা এখানে বলেছেন যে, ভারতীয় সামরিক বাহিনী তাদের তৎপরতা শুরুর পর বড়জোর দু'সপ্তাহ সময় নিবে বাংলাদেশের সকল শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। দূর্ভাগ্যজনক হলেও, প্রায় পাঁচ দশক পর আজ যখন আমি এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে লিখতে বসেছি, আমাকে এখনও এই লাইনগুলোর সাথে একমত পোষণ করতে হচ্ছে।
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত এত বেশি উন্নয়ন হয়েছে যে, এদেশের কোনো অংশ আজ দূর্গম নাই। প্রায় সকল নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। High-Intensity Warfare আরম্ভ হওয়ার পর অগ্রসরমাণ সেনাবাহিনীর পথে ৪০ মিটার কিংবা এর থেকে বেশি চওড়া নদী পড়লে তা শত্রু সেনার চলাচলকে অনেকাংশে সীমিত করে ফেলতে সক্ষম হয়। আজ বাংলাদেশে এরকম প্রশস্ত পানির সংখ্যা সীমিত হয়ে গিয়েছে এবং তাদের অধিকাংশের ওপর দিয়ে সেতু স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে আগ্রাসনের শিকার হলে দ্রুততম সময়ের মাঝে আমরা এগুলোকে ব্যবহারের অযোগ্য করতে পারব কিনা তা আমাদের জানা নেই।
দূর্গম তথা প্রাকৃতিক বাঁধার প্রসঙ্গে যখন আছি, তখন আরেকটা বিষয় নিয়েও কথা বলা দরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের মার্চের দিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর ওপরে থাকা অসংখ্য গাছপালা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রচণ্ড গরম চলাকালীন গাছ কাঁটার বিষয়টা বেশ অদ্ভূত ছিল। যদিও এর পেছনে গাছের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত যুক্তি দেওয়া হয়। তবে এরপরও বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা করা যেতে পারে।
CIA তাদের রিপোর্টের এই অংশে আরও একটা কথা বলেছে। তাদের মতে, নয়াদিল্লি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাশুট রেজিমেন্টকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে এই ক্যাম্পেইনে ব্যবহার করবে। সাথে সাথে হেলিবোর্ন অপারেশনও অত্যাধিক মাত্রায় চালানো হবে। এর মাধ্যমে সবকিছু দ্রুত শেষ করে ফেলার চেষ্টা হবে। যেন আন্তর্জাতিক মহল কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া জানাবার সময় না পায়।
"The December through April period normally provides the most favourable weather for offensive operations in Bangladesh."
পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হতে চললো। এমতাবস্থায় বাংলার আবহাওয়া, জলবায়ু পাল্টে গেছে। নদী-নালাও অনেক কমেছে। বরং বলা উচিত, কমানো হয়েছে। নদীর ওপর সেতু গড়ে উঠেছে। ভূমির ওপরে হয়েছে লম্বা সড়ক। মাটির আর্দ্রতা বা শুষ্কতার যে বিষয়, তা এখন বাঁধ খুলে দেওয়া আর বন্ধ করবার ওপরও অনেকখানি নির্ভর করে। সুতরাং, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বর্তমানে আগ্রাসন পরিচালনার জন্য অনুকূল সময়টা বলা যায় পাল্টে গিয়েছে। এখন সময়রেখাটি আমরা অক্টোবর থেকে শুরু করতে পারি।
লেখার এই পর্যায়ে এসে আমরা মনোযোগ দিব CIA এর রিপোর্টে Air Force নিয়ে যা বলা হয়েছে সে সম্পর্কে। মার্কিন গোয়েন্দারা ১৯৭৫ সালে মনে করতেন -
"India would have total air superiority over Bangladesh. Facing virtually no opposition from the Bangladesh Air Force."
কয়েক দশক পরে এসে মার্কিন গোয়েন্দাদের বাংলাদেশ এয়ারফোর্স সম্পর্কে এই বিশ্লেষণ আজও প্রযোজ্য বলে স্বীকৃতি দিতে হচ্ছে। উক্ত রিপোর্টে আরেকটু পরে আরও যোগ করা হয়েছে যে, ইণ্ডিয়ান এয়ারফোর্স দেশের চতুর্দিকের ঘাঁটিগুলোয় নিয়মিতভাবে মোতায়েন থাকা বিমান দিয়েই আলোচ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারবে। এবং গ্রাউণ্ড ফোর্সেসের সাহায্যে আসতে পারবে। অতএব, তারা বাংলাদেশে হামলা করতে চলেছে এর আগাম সতর্কবার্তা আমরা ওদের এয়ারফোর্সের মুভমেন্ট দেখে আন্দাজ করতে পারব না। এক্ষেত্রে আমাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর চলাচল সংক্রান্ত তথ্যের ওপর নজর রাখতে হবে।
শেষকথা হলো, '৭৫ এর পর কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে! অথচ, আজও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তখনকার একটা বিশ্লেষণ প্রযোজ্য। এখান থেকেই বোঝা যায় যে, আমাদের পূর্বেকার সকল নীতিনির্ধারকের দেশপ্রেম কতটা শক্তিশালী ছিলো।
তবে, আশা হারানো চলবে না। আঁধার গভীর হওয়া ভোরের নিকটবর্তী হওয়ার লক্ষণ। আর, আমরা আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করছি।
Comments
Post a Comment