·
(এই লেখাটি ২৩শে মার্চ, ২০২২ সাল তারিখে সর্বপ্রথম প্রকাশ করা হয়েছিলো। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুনরায় তা কিছুটা পরিমার্জন সহকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো)
কাশ্মির ফাইলসের নাম সম্ভবত আপনারা প্রত্যেকেই শুনেছেন। দি কাশ্মির ফাইলস। ভয়ঙ্কর মিথ্যা তথ্য সম্বলিত এই ফিল্ম ১১ই মার্চ, ২০২২ তারিখে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে মুক্তি পায়। মুক্তির সাথে সাথে এই চলচ্চিত্র ভারতের পদস্থ সরকারি কর্মচারী থেকে আরম্ভ করে শিশু-কিশোর পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মানসিকতায় এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। অধিকাংশ ভারতীয় এই প্রোপাগাণ্ডার কারণে হয়ে ওঠে অতিমাত্রায় উগ্রপন্থি। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, ফিল্মটি প্রকাশের কিছুদিন পূর্বেও যে ছেলেটা Facebook এ নরেন্দ্র মোদিকে ট্রল করতো, সে কাশ্মির ফাইলস দর্শনের পর নরেন্দ্র মোদি এবং তার দলের উগ্রবাদি নীতির মারাত্মক ভক্তে পরিণত হয়েছে।
লেখার এই অংশে সম্মানিত পাঠকের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন থাকবে। তা হলো, থিয়েটার থেকে কাশ্মির ফাইলস দেখে বেরিয়ে আসা দর্শকদের থেকে আপনারা কেমন শ্লোগান শুনেছেন? উত্তরে এই বিষয়ে অবগতরা সকলে সম্ভবত একমত হবেন যে, সেখানে মুসলিম মেয়েদেরকে জোরপূর্বক বিয়ে তথা ধর্ষণ করবার হুংকার শুনেছেন তাঁরা। তাহলে, আপনাদের কখনো এটা ভাবার সুযোগ হয়েছে কি? যে কেন ভারতীয়রা সুযোগ পেলেই মুসলিম নারীদের (এবং ভিন্নধর্মী সংখ্যালঘুদেরও) তাদের সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু বানায়? কেন ১৯৪৭ সালের দেশভাগের দাঙ্গা থেকে শুরু করে ২০০২ সালে গুজরাটে যে নৃশংসতা হলো নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে, সেখানে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলেন মুসলিম ঘরের মেয়েরা?
এর উত্তরকে কেন্দ্র করেই আজকের এই লেখা। আর উত্তর দু'টি শব্দের। Strategic Rape! সামরিক গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে একটু। তাই না? এর কারণ হলো, এটা সাধারণত আগ্রাসী সামরিক শক্তি দ্বারাই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর ধর্ষণের এমন প্রয়োগ, তার শুরুও আজ থেকে বহু পূর্বে। যেমন, গত শতাব্দীর বিশ্বযুদ্ধে জাপান, জার্মানি এবং রাশিয়া ও মার্কিন-বৃটিশ মিত্রশক্তির কথাতেই যদি আসি, ওরা একে অপরের নারীদের ওপর এই ঘৃণ্য কৌশলের ব্যাপক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলো। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান আর্মি ও তাদের দোসরদের হাতে এদেশে অসংখ্য নারীর নির্যাতনের শিকার হওয়াটাও উক্ত কৌশলের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়। গবেষকরা এমনকি একে Strategic Rape এর অন্যতম উদাহরণ বলেও মনে করে থাকেন।
একদম সাম্প্রতিককালের পরিসংখ্যান বলে, শুধুমাত্র ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মাঝেই যুদ্ধের কারণে ধর্ষণের স্বীকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪৫টি দেশের মেয়েরা। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এই ঘৃণ্য কৌশলের উদ্দেশ্যকে নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন - "যৌন সহিংসতা সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হলে তা নিঃসন্দেহে একটা জাতি কিংবা সমাজের জন্য প্রাণঘাতী অস্ত্রের ন্যায় বিধ্বংসী।"
তবে, এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষণ মানেই তা Strategic Rape নয়। এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু শর্ত প্রযোজ্য হয়ে থাকে। যেমন -
০১| শত্রুসেনারা ওদের কমাণ্ডের তরফ হতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই বিষয়ক নির্দেশনা গ্রহণ করবে। অতঃপর বাস্তবায়ন আরম্ভ হলে শত্রুপক্ষের নারীদের নির্যাতনের সময় তাঁদের প্রজনন অঙ্গ এবং শরীরের অন্যান্য স্পর্শকাতর অঙ্গ নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হবে। অত্যাচারের ক্ষেত্রে বিশেষ এই প্রক্রিয়া অনুসরণের উদ্দেশ্য, শত্রুর পরবর্তী প্রজন্মের পৃথিবীর বুকে আগমনের পথ যেন বন্ধ হয়ে যায় তা নিশ্চিত করা।
০২| নির্যাতিতার (ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতিত) স্পর্শকাতর অঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের মাজল, ছুরি, জলন্ত কয়লা কিংবা ভাঙ্গা কাঁচ ইত্যাদি প্রবেশ করানো হবে। গর্ভবতী নারীদের ধর্ষণের পর পেট চিরে বাচ্চাকে বের করে আনার ন্যায় নৃশংসতা চালানো হবে। এক্ষেত্রেও লক্ষ্যবস্তু শত্রুর পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীর আলো না দেখতে দেওয়া।
০৩| Strategic Rape এর ক্ষেত্রে আগ্রাসনের শিকার জাতির নারীদের মধ্য হতে বিশেষভাবে ছোট্ট মেয়ে এবং কিশোরীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। শিশুদের ভেতর এমনকি ০৬ মাস বা এর থেকেও কমবয়সী শিশুরা থাকতে পারেন। নির্যাতনের শিকার এসকল শিশু সাধারণত তাৎক্ষণিক বা কিছুসময় পর পৃথিবী হতে বিদায় নিয়ে থাকেন। কিশোরীদের ভেতর বেঁচে যাওয়া নির্যাতিতাদের জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা হয়। একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কিছু কনফ্লিক্টে Strategic Rape এর ৮০ শতাংশ ভিকটিম ছিলেন মেয়ে শিশুরা।
০৪| জনসম্মুখে জঘন্যতম উপায়ে ধর্ষণ করা হবে। ধর্ষিতার ওপর নারকীয় তাণ্ডব চলাকালীন পরিবারের সদস্য এবং এলাকাবাসীকে শত্রুরা তা দেখতে বাধ্য করবে। নির্যাতিতার ভাই, বাবা সহ আপনজনকে ভয়ংকর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে নির্যাতিতাকে ধর্ষণ করতে বাধ্য করা এসকল উপায়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এমন ঘৃণ্য কৌশল ব্যবহারের উদ্দেশ্য আক্রান্ত জাতির মনোবল ভেঙে ফেলা। তাদের মানসিকভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ের দূর্বল করে দেওয়া। জনসাধারণের ভেতর সর্বোচ্চ মাত্রার আতংক ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন সামরিক বাহিনী এই কৌশল ব্যবহার করে থাকে। জনসম্মুখে ধর্ষণের কৌশল ভারতের গুজরাটে প্রদেশে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০০২ সালে ব্যবহৃত হয়েছে।
০৫| গণধর্ষণ। গণধর্ষণ যুদ্ধক্ষেত্রে Sexual Violence এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। কিছু যুদ্ধে নির্যাতিতাদের ৯০ শতাংশ গ্যাং রেপের শিকার বলে জরিপে দেখা গিয়েছে।
রূয়ান্ডার International Criminal Tribunal যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্ষণকে কৌশল হিসাবে ব্যবহার সম্পর্কে বলে যে, "ধর্ষণ হলো নির্দিষ্ট একটি জাতিকে সমূলে ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান"। এই রূয়ান্ডাতে কিন্তু ১৯৯৪ সালে আধুনিক মানব ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম Genocide সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ের মাঝে সংঘটিত হয়। আমাদের জন্য রূয়ান্ডার সেই ভয়াবহ দিনগুলো ও এর পূর্বেকার সময়ের চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করা প্রয়োজন। যাইহোক।
Strategic Rape এর শিকার নারীরা প্রবল মানসিক এবং শারীরিক যন্ত্রণার শিকার হয়ে থাকেন। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটা এমনই। শুধুমাত্র আনন্দ উপভোগের উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্ষকের দল এখানে কাজ করে না। তাদের লক্ষ্য হয় মূলত নির্যাতিতার স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি নিশ্চিত করা। এই কারণেই তাঁদের স্পর্শকাতর অঙ্গ-প্রতঙ্গকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকে। বেঁচে যাওয়া ধর্ষিতারা ফলে আজীবন এই ক্ষত বহন করে যেতে বাধ্য হন। সাধারণত তাঁদের সেরে ওঠার জন্য একাধিক যন্ত্রণাদায়ক এবং জটিল সার্জারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবুও শারীরিক ক্ষত অনেক সময় পুরোপুরি ঠিক হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের আবার এত অর্থ খরচ করে চিকিৎসার সামর্থ্যও থাকে না, ধীরগতিতে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেন তাঁরা।
রণাঙ্গনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরো ভয়াবহ। জোরপূর্বক গর্ভধারণ করানোর পর গর্ভপাতের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় নির্যাতিতাদের একটা বড় অংশ মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই বিষয়টি ঘটানোও অন্যতম লক্ষ্য থাকে ধর্ষকদের। অনেক ধর্ষিতা অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। পাঞ্জাব থেকে কাশগড়, চেচনিয়া থেকে রমলা পর্যন্ত দুনিয়াব্যপী এমন হাজারো কূপ পাওয়া যাবে, যেসব কুয়ার মাঝে কওমের মুসলিম মেয়েরা নিজেদের জীবনের ওপর সম্ভ্রমকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রচেষ্টায় ঝাঁপ দিয়ে নিজেদের জীবনকে মিটিয়ে দিয়েছিলেন।
ধর্ষণের পর বেঁচে যাওয়া নারীদের শারীরিক ক্ষতি তো থাকেই। তাঁরা মানসিকভাবেও প্রচন্ড আঘাতের শিকার হয়ে থাকেন। গবেষকরা দেখেছেন যে, এই ভয়ানক আঘাতের ছাপ এমনকি পরবর্তীতে তাঁদের থেকে জন্ম নেওয়া শিশুদের মাঝেও রয়ে যায়। বিষন্নতা (Depression) এবং PTSD (Post-Traumatic Stress Disorder) এর শিকারে পরিণত হন এসকল নারীরা। ভয়ালো অভিজ্ঞতার মূহুর্তগুলো তাঁদেরকে জীবনের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত তাড়া করে ফিরে। উপযুক্ত চিকিৎসা ও সহযোগিতা না পেলে রাতের ঘুম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
লেখার শেষ পর্যায়ে আছি আমরা। এতক্ষণে সকলের বুঝে নেওয়ার কথা যে, Strategic Rape এর প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু নির্যাতনের শিকার নারীরা হলেও এই ঘৃণ্য কৌশলের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে সম্পূর্ণ একটি জাতি। আর এর আরম্ভ শত্রুর মূল সামরিক আক্রমণের অনেক আগে থেকে হয়ে থাকতে পারে। একজন নারীর সম্ভ্রমের ওপর যখন হামলা হয়, এর অর্থ তা পুরো একটি পরিবারের ওপর হামলা, সমাজের ওপর হামলা, এবং জাতির ওপর হামলা। এজন্যই ধর্ষণ এত ভয়ানক একটি অস্ত্র। ধর্ষণকে Modern Warfare এর একটি ঘৃণ্য কার্যকরী কৌশল হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ভারতে ২০০২ সালে ঘটে যাওয়া কুখ্যাত গুজরাট দাঙ্গায় সুনিপুণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছিলো Strategic Rape নামক এই নৃশংস কৌশলের। জনসম্মুখে ভয়ংকরভাবে তখন মুসলিম কিশোরী এবং নারীদের ধর্ষণ করা হয়। শত শত মুসলিম নারীকে গণধর্ষণের পর চিতার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়! নয় মাসের গর্ভবতী মাকে ধর্ষণের পর মায়ের পেট চিরে বের করে নেওয়া হয় বাচ্চাকে। মা এবং শিশু দুজনকেই অতঃপর আগুনে ছুঁড়ে ফেলে নরেন্দ্র মোদির অনুসারীরা! গুজরাট নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসিয়েছে। গুজরাট প্রথম ছিলো না। গুজরাটে শেষও হয়নি। গুজরাটের শতবর্ষ আগে থেকে উপমহাদেশের দাঙ্গায় এই ঘৃণ্য কৌশলের প্রয়োগ আরম্ভ হয়েছে। ইণ্ডিয়ান আর্মড ফোর্সেস হায়দ্রাবাদ দখলের পর সেখানে রীতিমতো ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলো।
এছাড়াও, অধিকৃত কাশ্মিরের গাইনি চিকিৎসকদের নিকট এমন নারীরা চিকিৎসার জন্য আসেন, যাদের প্রজনন অঙ্গ ভারতীয় সেনাদের গণধর্ষণের ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ।
আপনারা এতক্ষণ যাবত Genocide এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পৃথিবীর জঘন্যতম একটি কৌশলের বিবরণী পড়েছেন। আপনারা পার্শ্ববর্তী দেশে এর প্রয়োগ সম্পর্কেও জেনেছেন। আপনারা এটাও পড়েছেন যে, এই কৌশলের প্রয়োগ যার নেতৃত্বে হয়েছিলো, সেই নরপিশাচ আজ স্বয়ং দেশটির Prime Minister পদে আসীন। আর ওর সহযোগীরা রয়েছে রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসনে। আপনারা সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে মৌমিতার ঘটনা শুনেছেন। আপনারা নিয়মিত ভারত থেকে এমন অসংখ্য ঘটনা শুনতে পান, যেখানে নৃশংসতম, উদ্ভাবনী উপায়ে এই ঘৃণ্য অপরাধটি ঘটানো হচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের পর ওখানে আদালত থেকে সাজা মওকুফ এবং ফুলেল শুভেচ্ছা পেতেও দেখেছেন আপনারা। সবকিছু বিবেচনা করে আপনারাই সিদ্ধান্তে আসুন। আমার দায়িত্ব শুধুমাত্র আপনাদের অবগত করা।
ধন্যবাদ।
Comments
Post a Comment