সাম্প্রতিক সময়ে Ten Trucks Arms & Ammunition Haul নিয়ে মানুষকে বেশ সজাগ দেখতে পাচ্ছি। আপনারা নিশ্চয়ই এটাও দেখছেন যে, দশ ট্রাক অস্ত্রের অপারেশনটির সাথে জড়িত মানুষগুলো এখন কোথায় আছেন এবং কেমন আছেন। যারা জানেন না তাদের জন্য ইন শা আল্লাহ পুরো বিষয়টা নিয়ে লেখা হবে। তবে, আপাতত চলুন আমরা তুরস্কে অনুরূপ আরেক ইনসিডেন্টের দিকে নজর বুলিয়ে আসি। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের কথা এটা।
১৯শে জানুয়ারি, ২০১৪ তারিখ।
তুরস্কের আদানা প্রদেশের অভ্যন্তর দিয়ে দ্রুততার সাথে পাড়ি দিচ্ছে ০৩টি মালবাহী লরির কনভয়। গন্তব্য তাদের সিরিয়ান সীমান্ত অঞ্চল। নিশ্চিন্তে সীমান্তের দিকে অগ্রসর হতে থাকা এই কনভয়টির অফিসিয়াল পরিচিতি হলো, তারা সিরিয়ার অভ্যন্তরে থাকা নিপীড়িত মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা বহন করছে। তবে, এখানে বাস্তবতা ছিলো অনেক বেশি মারাত্মক!
আদানার বিচার বিভাগের চিফ প্রসিকিউটর এই বাস্তবতা সম্পর্কে যেভাবেই হোক অবগত হয়ে যান। তাই কনভয়টি তার জুরিসডিকশনের মধ্যে অবস্থান করছে এই তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ামাত্র তিনি আদানার পুলিস ডিপার্টমেন্টকে কনভয় থামাবার অর্ডার দেন। তবে, প্রদেশের গভর্নর এমন তৎপরতার ব্যাপারে আগে থেকে জানতে পেরে সেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। ফলে পুলিস বাহিনী প্রসিকিউটরের অর্ডার মানতে অস্বীকার করে!
এরপরও চিফ প্রসিকিউটর থামতে রাজি হলেন না। আদানার পুলিসকে ডিঙিয়ে এবার তিনি সোজা চলে যান রিজিয়নে থাকা জেণ্ডারমেরি জেনারেল কমাণ্ডের কাছে। এই বাহিনীটা তুরস্কের ক্ষেত্রে অনেকটা রাশান ন্যাশনাল গার্ডের অনুরূপ। যাইহোক, চিফ প্রসিকিউটর সেখানকার জেণ্ডারমেরি রেজিমেন্টের কমাণ্ডার স্টাফ কর্নেল ওজঁকানকে পুলিসের স্থানে এই কনভয়ের ওপর তল্লাশি চালাবার আদেশ দেন। এসময় কর্নেল ওজঁকান অর্ডার পালন করতে অস্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখানো হয়। সুতরাং, রাজি হন তিনি।
জেণ্ডারমেরি থেকে ১২৫ জন সদস্যের একটা দল তখন অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হয়৷ কর্নেল ওজঁকান এবং চিফ প্রসিকিউটর তাদের এই অ্যাডভেঞ্চার সম্পর্কে কমাণ্ডের সিনিয়র লিডারশিপ তথা জেণ্ডারমেরির কমাণ্ডিং জেনারেল সেরঁভেত ইওরূঁক, তাদের রিজিয়নাল কমাণ্ডার ব্রিগেডিয়ার হামজা কিংবা রিজিয়নাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরকে অবহিত করা থেকে বিরত থাকেন।
এর ফলাফল হয় ভয়াবহ।
সিরিয়ার পথে চলন্ত এসকল লরি ছিলো তুরস্কের প্রিমিয়ার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (MIT) দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত। মানবিক সহায়তার আড়ালে যারা কিনা নিয়মিত সীমান্ত পেরিয়ে সিরিয়ার অভ্যন্তরে বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সিরিয়ান গেরিলাদের জন্য ওয়েপন্স শিপমেন্ট বহন করছিলো। এই তথ্য সম্পর্কে তখন পর্যন্ত বেখবর জেণ্ডারমেরি ইউনিট অপারেশন আরম্ভ করে কনভয় থামিয়ে বসলে সাথে সাথে কনভয় থেকে MIT অপারেটিভরা নেমে আসেন। এসময় তাঁরা উপস্থিত জেণ্ডারমেরি অফিসারদের কাছে নিজেদের পরিচয় দেন এবং নির্দেশ দেন যেন কনভয়ে হাত না লাগানো হয়। তাদের উক্ত নির্দেশনা অমান্য করে কনভয়ে তল্লাশি আরম্ভ হয় এবং এবার শুরু হয় হতবাক হওয়ার পালা!
জেণ্ডারমেরির দল লরির ভেতরে থরে থরে সাজানো মর্টার শেল, আর্টিলারি রাউণ্ড, ৫০,০০০ রাউণ্ড মেশিনগানের বুলেট এবং ৩০,০০০ রাউণ্ড রাইফেলের বুলেট আবিষ্কার করে। আর এই সম্পূর্ণ সাপ্লাই রওয়ানা করানো হয়েছিলো সিরিয়ার অভ্যন্তরে MIT সমর্থিত বিপ্লবীদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে।
ওদিকে আদানার প্রাদেশিক গভর্নর হুসেঈন কোনোভাবে পুনরায় তার অঞ্চলে চলমান এই সার্চের ব্যাপারে খবর পেয়ে যান। খবর পাওয়ামাত্র কিছুক্ষণের ভেতর তিনি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হয়ে চিফ প্রসিকিউটরকে ইমিডিয়েটলি তল্লাশি বন্ধের আদেশ দেন। এসময় তিনি কনভয়টি MIT এর নিয়ন্ত্রিত ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট মর্মেও উপস্থিত অফিসারদের অবহিত করেন। উপস্থিত জেণ্ডারমেরি এলিমেন্ট তখন তাকে এর প্রমাণ দেখাতে অনুরোধ জানায়। এই বাদানুবাদ চলছিলো, এমতাবস্থায় কিছুক্ষণের ভেতর স্বয়ং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের সিনিয়র অপারেটিভদের দল ঘটনাস্থলে হাজির হয়।
চিফ প্রসিকিউটরের কথায় রিজিয়নাল জেণ্ডারমেরির এই অ্যাডভেঞ্চারের পরিণতি অতঃপর খুব একটা সুবিধার হয়নি। তল্লাশি তৎপরতার সাথে জড়িত অফিসারদের বাহিনী থেকে দ্রুত বরখাস্ত করে দেওয়া হয়, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। চিফ প্রসিকিউটর নিজেও তার পদ থেকে বরখাস্ত হন। তল্লাশির ভিডিও মিডিয়ায় এলে স্বয়ং রিঁসেপ তাইয়েব এরদোয়ান মিডিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ভিডিও প্রকাশের সাথে জড়িত পত্রিকার সম্পাদক ও আরেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অবশেষে, ২০১৯ সালে তুরস্কের বিচারকেরা তল্লাশির সাথে জড়িত ২২ জন অফিসারকে দুই থেকে বিশ বছর মেয়াদে জেল প্রদান করে। এসময় বলা হয় যে, মামলার আসামিরা ফেতুল্লা গুঁলেনের FETO এর সাথে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী।
শেষকথা:
তুরস্কে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে এই পরিণতি হওয়ার কারণ ছিলো, মিল্লি ইসতিহবারাত তুরস্কের সংস্থা। সেখানে অধিকাংশ প্রচলিত অর্থের বিশ্বাসঘাতক নয়। একারণে তুরস্কের ভেতরে ও বাইরে তাদের তেমন সুনাম এবং প্রভাব বিদ্যমান। অন্য কোনো সংস্থা তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করবার দুঃসাহস তাই কখনোই দেখায় না এবং দেখালে তারা উদাহরণে পরিণত হয়ে থাকে।
Comments
Post a Comment