২০শে জুমাদাল উলা, ৮৫৭ হিজরি।
সেন্ট রোমানুস গেট, কনস্টান্টিনোপল।
৫৭০ বছর আগের কথা। ইতিহাসের পাতায় সময়টা ছিল এক নতুন অধ্যায় রচনার মূহুর্ত। রক্ত আর আগুনের মিশ্রণে তৈরি কালিতে যে অধ্যায়ের শিরোনাম লিখছিলেন উসমানি সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের বাহিনী। যেখানে পৃষ্ঠা ছিল হাজার বছর ধরে অপরাজেয়, কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীর! ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যে প্রাচীর আজ হার মানতে চলেছে। খুলে দিতে চলেছে বহু শতাব্দী যাবত অগণিত দিগ্বিজয়ী সেনাপতির আক্রমণের মুখে নির্বিকারভাবে দণ্ডায়মান থাকা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানীর দ্বার!
কিন্তু, এমন বিরাট কীর্তি তো সহজে ধরা দিবে না! ইতিহাস রক্তের কালিতে লেখা একটি বইয়ের নাম। আর, কালির পরিমাণ যার যত হবে, তার অধ্যায়ের বিস্তৃতিও হবে তত বেশি। উসমানিদের ২০শে জুমাদাল উলার সকালটা তাই কেটে গেলো এই কালির সরবরাহেই।
সেদিন সকালের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ মাত্রার নির্মম। সকাল নামার পূর্বে সমগ্র রাতজুড়ে উসমানি সেনাবাহিনী যিকির-আযকার, তাসবিহ-তাহলিল আর দু'আর মাঝে কাটিয়ে দেন। এসময় সুলতান তাঁর সাথীদের বলেছিলেন - "আমরা আগামীকাল যোহরের নামাজ আয়া সুফিয়ার গির্জায় আদায় করব, ইন শা আল্লাহ!"
এরপর ফজরের নামাজ শেষ হওয়ামাত্র উসমানি সশস্ত্র বাহিনী ফয়সালাকারী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। উসমানি যোদ্ধারা শহরের চতুর্দিকে থাকা পরিখা অতিক্রমের জন্য তার ওপর সিঁড়ি ও জাল ফেলে অগ্রসর হন। সেদিন উসমানি বাহিনী তাঁদের সুলতানের চিন্তাধারা মাথায় করে নেমেছিল। যিনি বলেছিলেন - "আজ কনস্টান্টিনোপল আমার হবে, অথবা আমি তার হয়ে যাব!"
আক্রমণের প্রচণ্ডতা উপলব্ধি করে শহরের ভেতরে অবস্থান নেওয়া বাইজেন্টাইন সেনারাও সেদিন প্রবল বীরত্বের সাথে লড়তে শুরু করে। শহরের প্রাচীরকে কেন্দ্র করে প্রবাহিত হতে শুরু করে গরম তেল, উত্তপ্ত আগুন আর তাজা রক্তের স্রোত। সুলতান মুহাম্মাদ উসমানি গোলন্দাজদের হাতে এই যুদ্ধে যে বিশেষ কামান তুলে দিয়েছিলেন, তার গোলা শহরের সেন্ট রোমানুস ফটকের আশপাশের দেওয়াল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছিল। সুতরাং উসমানি সেনাবাহিনী এদিন সেখানে বিশেষ মনোযোগ দেয়। কিন্তু, শত চেষ্টার পরও বাইজেন্টাইন সেনাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে দুপুর পর্যন্ত একজন সেনাও প্রাচীর অতিক্রম করতে ব্যর্থ হন।
আসলে কনস্টান্টিনোপল সেদিন চূড়ান্ত আত্মত্যাগের নিদর্শন চাইছিল। "আমার উম্মতের একটি বাহিনী কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। সেই আমির কতই না উত্তম আমির হবে! আর সেই বাহিনী কতই না উত্তম বাহিনী হবে!"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভবিষ্যদ্বানীর বাহিনী তাঁদের সুলতানের সাথে সেদিন পৌছে গিয়েছিল শহরের দোরগোড়ায়। তাঁরা বাছাইকৃতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বাকি ছিল আরেকটু আত্মত্যাগ। যেন এর নিদর্শন এরপর থেকে যেতে পারে যুগে যুগে উম্মতের পথহারা তরুণদের পথ প্রদর্শনের জন্য। অতএব, রণক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন স্বয়ং সুলতান মুহাম্মাদ ও তাঁর বিশেষ অশ্বারোহীর দল!
এসময় সুলতানের এই বিশেষ সেনাদলের সাথে একজন দূঃসাহসী উসমানি কমাণ্ডারও রণাঙ্গনের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। যার পরিচয় আমরা ইতিহাসের পাতায় আজ আগা হাসান বলে জানি। লড়াইয়ের এই পর্যায়ে উসমানি বাহিনীকে তখন ক্লান্তি স্পর্শ করতে শুরু করেছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমেছে, সাফল্যের দেখা মেলেনি। জয়-পরাজয়ের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় তখন লড়ে যাচ্ছিলেন উসমানি সেনারা। এমন এক পরিস্থিতিতে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেন কমাণ্ডার হাসান। ঐসময় তিনি বহন করছিলেন নিজের বিশেষ উসমানি তরবারি, ছোট্ট ঢাল এবং উসমানি বাহিনীর নিশান!
আগা হাসান ও তাঁর ৩০ জন সাথী এসময়ে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি দেখে উসমানি পতাকা নিয়ে বেপরোয়া ভঙ্গিতে সেন্ট রোমানুসের দিকে অগ্রসর হন। প্রাচীরের ওপরে অবস্থান নেওয়া বাইজেন্টাইন সেনারা অবস্থা দেখে তাঁদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু, ওদের প্রতিরোধের পরওয়া না করে হাসান ও তাঁর সঙ্গীরা ঝড়ের গতিতে দেওয়ালের ওপর চড়ে বসলেন! প্রাচীরের ওপর তখন পঙ্গপালের ন্যায় ছড়িয়ে ছিল বাইজেন্টাইন সেনারা। আগা হাসান তাঁর সাথীদের নিয়ে প্রাচীরে আরোহন করামাত্র সঙ্গে সঙ্গে এরা তাঁর ১৮ জন সঙ্গীকেই প্রাচীর হতে ফেলে দেয়। আগা হাসান ততক্ষণে এসব নজরে দেওয়ার উর্ধ্বে চলে গেছেন। তিনি তরবারি আর উসমানি নিশান হাতে প্রাচীরের ওপর সগর্বে উড়ন্ত বাইজেন্টাইন পতাকার দিকে অগ্রসর হন। প্রাচীরের ওপর অবশিষ্ট থাকা তাঁর বাকি ১২ জন সঙ্গীও এসময় তাঁর পেছনে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু, ততক্ষণে তিনি সঙ্গীদের নাগালের বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত সেন্ট রোমানুসের দেওয়াল বাইজেন্টাইন সেনাদের থেকে পরিষ্কার করে তাঁর সঙ্গীরা যখন আগা হাসান পর্যন্ত পৌঁছাতে সমর্থ হন, তখন তাঁরা প্রবল বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে পড়েন!
তাঁদের চোখের সামনে, এক পলকে যেন পাল্টে গেছে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি! এক হাজার বছর ধরে সেন্ট রোমানুসের ওপর স্ব-গর্বে উড়ে চলেছে যে বাইজেন্টাইন পতাকা, তা এখন অদৃশ্য। সে জায়গায় এখন গর্বিত ভঙ্গিতে উড়াল দিয়েছে সুলতান মুহাম্মাদের উসমানি নিশান!
এই এক দৃশ্য সমগ্র রণক্ষেত্র জুড়ে ভেঙে চুরমার করে দিলো বাইজেন্টাইন সেনাদের মনোবল। পালাতে শুরু করলো তারা! অন্যদিকে সেন্ট রোমানুসের ওপর উসমানি নিশানের উড়ে বেড়াবার দৃশ্য যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে উসমানি বাহিনীর রক্তে। আশার আলোয় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন তাঁদের প্রত্যেক যোদ্ধা। তবে কি তাঁরাই হতে চলেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই অপূর্ব বাহিনী! পিছু হটতে থাকা বাইজেন্টাইন সেনাদের তাড়িয়ে শহরের ভেতর ঢুকে যেতে শুরু করলেন তাঁরা! আর এই পুরো কীর্তি যার হাত ধরে সম্পন্ন হলো, সেই আগা হাসান?
আগা হাসানকে প্রাচীর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ১২ জন সাথী যখন তাঁর কাছে পৌছুলেন, ততক্ষণে তিনি নশ্বর এই পৃথিবী ছেড়ে চিরস্থায়ী জগতের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন। এসময় তাঁর শরীরে দৃশ্যমান ছিল ২৭টি বাইজেন্টাইন তীরের আঘাত!
অর্থাৎ, তিনি যখন দেওয়ালে উসমানি নিশান উত্তোলন করছিলেন, সেসময় বাইজেন্টাইন তীরন্দাজেরা তাঁর ওপর বৃষ্টির ন্যায় তীর নিক্ষেপ করে। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এসময় এই দূঃসাহসী সেনানি বীরত্ব আর দৃঢ়তার চরম পরাকাষ্ঠার প্রদর্শনী ঘটান। নিজের শেষ জীবনীশক্তি ব্যবহার করে তিনি হাল ধরে বসেন মুসলিম বাহিনীর। নিজের ও নিজ বন্ধুদের প্রাণের বিনিময়ে তিনি ঘুরিয়ে দেন তাঁদের বিজয়ের দিকে।
আল্লাহ তায়ালা আগা হাসান উলুবাতির ওপর রহমত বর্ষণ করুন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে উম্মতে মুহাম্মাদির যে সন্তান তীরের বৃষ্টির মাঝে জীবন্ত টর্নেডোতে পরিণত হয়েছিলেন। নিজেকে যিনি প্রমাণ করেছিলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীর সেই অপূর্ব সেনাদলের একজন বলে! যার রেখে যাওয়া উদাহরণ দূর্যোগে আক্রান্ত এক প্রজন্মের চলার পথে পাথেয় হবে। ইন শা আল্লাহ!
ধন্যবাদ।
Comments
Post a Comment