চাণক্য ছিলেন মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা। চন্দ্রগুপ্তের হাতে তক্ষশীলার নিয়ন্ত্রণ আসার পর তিনি এই সুপরিচিত বিদ্যাপীঠে পাঠদান করতেন। এই বুদ্ধিজীবির হাত ধরে তখন চন্দ্রগুপ্তের সাহায্যে শুরু হয় মিলিটারি সায়েন্স, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইকোনমিক পলিসি, স্পাইক্র্যাফট, স্টেটক্র্যাফট বিষয়ক এক গ্রন্থের কাজ। যাকে আজ মানুষ অর্থশাস্ত্র নামে জানে।
এই অর্থশাস্ত্র বইয়ের গুপ্তচরবৃত্তি বিষয়ক পাঠের ভেতর Honey Trap নামের এক বিশেষ কৌশলের বর্ণনা করা হয়েছে। যেখানে উল্লেখিত হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন নারী গুপ্তচর এবং গুপ্তঘাতক সংগঠনের কথা। অত্যন্ত সুন্দরী এসব মেয়েদের সেকালে বলা হতো বিষকন্যা! খুব ছোটবেলা হতে যাদেরকে বিভিন্ন রকমের বিষাক্ত সাপ ও অন্যান্য বস্তুর বিষ পান করানো হতো। এক্ষেত্রে প্রথমে পরিমাণে খুব কম বিষ দেওয়া হতো। ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতো এর পরিমাণ। এর মাধ্যমে এসব মেয়েদের শরীরে বিষের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি তৈরী হতো। একইসাথে কিছুক্ষেত্রে শরীরের অভ্যন্তরে থাকা সর্বপ্রকার তরল পদার্থ নিজেরাও আলাদাভাবে বিষের ন্যায় কাজ শুরু করতো। মেয়েদের বড় একটা অংশ এই প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে বেঁচে থাকতে পারতো না।
যারা বেঁচে যেতো, তাদের অতঃপর শেখানো হতো Art of Seduction সহ আরও নানাবিধ গুপ্তচরবৃত্তির কৌশল। বিষকন্যারা ছিলেন মূলত গুপ্তঘাতক। যাদের প্রশিক্ষণ শেষে শত্রুদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেখানে তারা নিজস্ব সৌন্দর্য ব্যবহার করে রাজ্যের পদস্থ নীতিনির্ধারকদের মহলে অনুপ্রবেশ করতেন। এরপর, সময় হয়ে গেলে তাদের হাতে প্রাণ হারাতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি।
বর্তমান যুগে বিষকন্যারা নেই। তাদের মূল সংগঠনেরও বিলুপ্তি ঘটে গেছে বহু আগেই। কিন্তু, তাদের রেখে যাওয়া কৌশল যুগে যুগে নানানভাবে নানান দেশের স্পাইমাস্টাররা ব্যবহার করে এসেছেন। আর এই ব্যবহার ছিলো বিরতিহীন। বিশেষ করে গত শতাব্দীতে পৃথিবীজুড়ে যখন কোল্ড ওয়ার চলেছে, তখন সোভিয়েত এবং ন্যাটো ইন্টেলিজেন্স অফিসারেরা খুব কার্যকরভাবে একে অপরের ওপর এই বিশেষ কৌশলের ব্যবহার চালিয়েছে বলে শোনা যায়। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কো থেকে ৫০০ মাইল দূরে গেলে আজও দেখা মিলবে এই আধুনিক যুগের বিষকন্যা একাডেমির। State School-4 নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে সোভিয়েত তরুণীদের সহ কিছু তরুণদেরও কিভাবে নিজের শরীর এবং চেহারার সৌন্দর্য, বাচনভঙ্গি, বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা যায়, সে আর্ট শিক্ষা দেওয়া হতো। কিছু ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট অনুসারে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে এই স্কুল পুনরায় চালু করেছে SVR।
এখন পর্যন্ত এখানে ইন্টেলিজেন্স জগতে প্রচলিত যে বিশেষ গুপ্তচরবৃত্তির কৌশল সম্পর্কে লেখা হলো, তাকে ইংরেজিতে অনেক জায়গায় Sexpionage ও বলা হয়ে থাকে। এবং এর ফাঁদ বড় ভয়ানক। কিন্তু, এই ফাঁদে গত হাজার বছর যাবত মানুষকে ফেলবার জন্য ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের যুগে যুগে স্ব-শরীরে টার্গেটের সামনে উপস্থিত হতে হয়েছে। তার সাথে সময় কাটাতে হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়তো বছরের পর বছর টার্গেটের সাথে বসবাসও করতে হয়েছে। তবে, বর্তমান যুগে ডিজিটাল কমিউনিকেশন সিস্টেমের উদ্ভবের সাথে অনেকক্ষেত্রেই পাল্টে গেছে এই প্রক্রিয়া। আর, এই Honey Trap এর ডিজিটাল মডেলের সবচেয়ে বড় ভিকটিম হিসাবে উঠে এসেছে খোদ চাণক্যের অনুসারীদের দেশ ভারতের নাম!
এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক কান্ডে ধরা পড়া ব্যক্তি হলো ইন্ডিয়ার ডিফেন্স রিসার্চ & ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO) কন্ট্রাক্টর প্রবীণ মিশ্রা। যাকে একজন পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অফিসার সোনাল গার্গ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে ফাঁদে ফেলতে সমর্থ হয়। সোনাল গার্গ উক্ত প্রবীণ মিশ্রার সাথে খুব সম্ভবত ফেসবুকের মধ্য দিয়ে পরিচিত হয়। এসময় সে নিজেকে IBM এর চণ্ডিগড় শাখায় কর্মরত নারী হিসাবে উপস্থাপন করে। অতঃপর তার কাছ থেকে এই সোনাল গার্গ কৌশলে বিভিন্ন সময়ে DRDO এর বেশ কিছু ক্লাসিফায়েড রিসার্চ ডকুমেন্ট হাতিয়ে নিতে সমর্থ হয়।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার জন্য সবচেয়ে আশংকার বিষয় হলো, তাদের রাষ্ট্রীয় অর্গানাইজেশনগুলোর ভেতরে এমন অসংখ্য প্রবীণ মিশ্রারা বসে আছে। গত বছরের মে মাসে ওরা এই DRDO থেকেই সিনিয়র সায়েন্টিস্ট প্রদীপ কুরুলকারকে ধরে নিয়ে যায়। এই ব্যক্তি আরেক পাকিস্তানি গুপ্তচরের ফাঁদে পড়েছিল। হোয়াটসঅ্যাপে উক্ত নারী নিজেকে জারা দাসগুপ্ত নামে পরিচয় দেয়। জারা দাসগুপ্ত এসময় প্রদীপের সাথে Text Messaging ও ভিডিও কলের মাধ্যমে অন্তরঙ্গতা তৈরী করে। অতঃপর একপর্যায়ে কুরুলকার নিজ ক্লাসিফায়েড DRDO প্রজেক্টের তথ্য জারার হাতে তুলে দেন।
ইন্ডিয়ান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনগুলোর ভাষ্যমতে, পাকিস্তানি ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ISI) রাওয়ালপিন্ডিতে সোভিয়েত State School-4 এর অনুরূপ একটি নিজস্ব স্পাই স্কুল চালু করেছে। যেখানে আকর্ষণীয় পাকিস্তানি মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এধরণের তৎপরতা চালনায় সক্ষম হিসাবে গড়ে তোলা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশের ঢাকায় প্রশিক্ষণ নিতে আসা একজন ইন্ডিয়ান আর্মি লেফটেন্যান্ট কর্নেল এই বিশেষ ধরণের পাকিস্তানি অপারেটিভদের প্রথম ভিকটিম হিসাবে চিহ্নিত হন। ঢাকায় অবস্থানকালীন এক পার্টিতে তার সাথে একটা মেয়ের সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তীতে উক্ত সূত্র ধরে তার সাথে পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অফিসাররা কনট্যাক্ট স্থাপনের চেষ্টা করে। এসময় তাদের কাছে উক্ত মেয়ের সাথে ভারতীয় সেনাকর্মকর্তার অন্তরঙ্গ মূহুর্তের ভিডিও ছিলো। তবে, এই প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। কারণ, পাকিস্তানি অপারেটিভদের শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে বুঝতে পেরেই উক্ত কর্মকর্তা সরাসরি ঢাকার ইন্ডিয়ান হাই কমিশনে সম্পূর্ণ ঘটনা রিপোর্ট করে দেয়। এই সেনাকর্মকর্তা ইন্ডিয়ান আর্মির প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের (Para SF) অন্তর্গত ছিলো।
এরপর ২০১৯ সালে এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর শতাধিক সদস্য পাকিস্তানি গুপ্তচরদের Honey Trap এর শিকারের সন্দেহভাজন হিসাবে ইন্ডিয়ান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের মনিটরিংয়ে ছিলো। যদিও, ফাঁদে পড়াদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলেই মনে করা হয়। এই সমস্যা বর্তমানে ভারতীয়দের ভেতর এতো বেশি ভয়াবহ হয়ে দাড়িয়েছে যে, ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স অনলাইন Honey Trap শণাক্ত করার লক্ষ্যে Artificial Intelligence প্রযুক্তি ডেভলপের কাজ শুরু করেছে।
শেষকথা:
Honey Trap এসপিওনাজ জগতের সবচেয়ে নোংরা ও অনৈতিক কৌশলগুলোর ভেতর শীর্ষ একটা কৌশল। এর শিকার ও শিকারি দু'পক্ষের মানসিকতাই সাধারণত চরম পর্যায়ের বিকৃত হয়ে থাকে। তবে, বিশেষভাবে বিকৃত মানসিকতার হয়ে থাকে শিকারির মানসিকতা। আর, নিজ মেয়েদের সম্ভ্রমকে ব্যবহার করে যে রাষ্ট্র টিকে থাকবার চেষ্টা করে, তাদের টিকে থাকাটা আসলে উচিত নয়। আর এমন অনৈতিক ও লজ্জাজনক কৌশল কখনো গর্বের উপাদান হওয়াটাও উচিত নয়।
Comments
Post a Comment