০৪ঠা জুলাই, ১৯৭৬ সাল।
এন্টেবে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, উগাণ্ডা। রাত তখন ১১টা বেজে ৪৫ মিনিটের আশপাশে। অল্প কিছুক্ষণ পূর্বে এই এয়ারপোর্টে বয়ে গেছে এক বিধ্বংসী টর্নেডো। '৭৬ সালের জুনের ২৭ তারিখে তেল-আবিব থেকে প্যারিসের উদ্দেশ্যে ডিপারচারের পর ছিনতাই হওয়া Air France এর এয়ারবাসকে ফিলিস্তিনি গেরিলারা ঘুরিয়ে এই এয়ারপোর্টেই অবতরণ করিয়েছিলেন। এরপর থেকে জুলাইয়ের ০৩ তারিখ পর্যন্ত বিমানটি উগাণ্ডার রাষ্ট্রপ্রধান ইদি আমিনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বন্দিদের সহ এই বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলো।
অতঃপর, ০৪ তারিখ হতে তখন বাকি মাত্র এক ঘন্টা, এমন সময়ে দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে নতুন কিছু চরিত্রের।
ঘড়ির কাঁটা তখন কাঁটায় কাঁটায় এগারোটার ঘর স্পর্শ করেছে। এমন সময় আচমকা অন্ধকার আকাশ চিরে এয়ারপোর্টের রানওয়ের ওপর উদয় হলো দানবীয় অবয়ব! দেখতে না দেখতে সেটা দ্রুতগতিতে এন্টেবের রানওয়েতে নেমে আসে। ততক্ষণে ওখানে থাকা সকলের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে অবয়বটির পরিচয়! শূণ্য থেকে ভূতের মতো উদয় হওয়ার পর হঠাৎ যে এয়ারক্রাফট এখানে অবতরণ করেছে, সেটা একটা সি-১৩০। মিলিটারি ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট। রিয়ার কার্গো ডোর খোলা অবস্থায় বিমানটা যখন এন্টেবের মাটি স্পর্শ করছে, তখন এর ভেতরে বসা সম্পূর্ণ সুসজ্জিত একটা ইসরায়েলি অ্যাসল্ট টিম! যাদের প্রত্যেকে কুখ্যাত ইসরায়েলি স্পেশাল অপারেশন্স ইউনিট, সায়রেত মাতকালের অংশ।
সেদিন জেনারেল স্টাফ রিকনাইস্যান্স ইউনিট তথা সায়রেত মাতকাল কমান্ডোরা এন্টেবেতে সর্বমোট ৫৩ মিনিট সময় অবস্থান করে। এসময় ওরা ১০২ বন্দিকে জীবিত বের করে আনে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন ওদের হাতে উগাণ্ডার সেনাবাহিনীর ১০০ জনেরও বেশি সৈনিক এবং ০৭ জন ফিলিস্তিনি গেরিলা যোদ্ধা প্রাণ হারান। ধারণা করা হয় যে, ইসরায়েলি কমান্ডোরা তখন উগাণ্ডান এয়ারফোর্সের ২৫ শতাংশ এয়ারক্রাফট ভূমিতে ধ্বংস করে ফেলে।
বহু দশক পর এই অপারেশন আজও পৃথিবীজুড়ে অনেক স্পেশাল ফোর্সেস স্কুলের সিলেবাসের অংশ। সেদিন এই অপারেশনের কোডনেম দেওয়া হয় অপারেশন থাণ্ডারবোল্ট। আর এই অপারেশন থাণ্ডারবোল্টের গ্রাউণ্ড ফোর্সেস কমাণ্ডার হিসাবে যে ইসরায়েলি অফিসারকে নির্বাচন করা হয়, তার নাম ছিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথান নেতানিয়াহু। হ্যা! প্রাইম মিনিস্টার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভাই। আপন বড় ভাই।
অপারেশন থাণ্ডারবোল্ট চলাকালীন বন্দিদের সফলভাবে বের করে আনবার পর যখন তাদের ইসরায়েলি স্পেশাল অপারেটররা সি-১৩০ এ লোড করছিলো, তখন এয়ারপোর্টের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার হতে উগাণ্ডান আর্মির সেনাসদস্যরা ওদের ওপর ফায়ার ওপেন করেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল নেতানিয়াহু তখন এই আচমকা গুলিবৃষ্টির একমাত্র শিকারে পরিণত হয়।
আজ হঠাৎ করে এই ইতিহাস সকলের নজরে আনার প্রয়োজনবোধ করলাম। কারণ, কিছুক্ষণ পূর্বে একজন ইসরায়েলি মিলিটারি অফিসারের বরাতে Middle East Eye এর একটা রিপোর্ট নজরে এলো। সেখানে তারা লিখেছে যে, নেতানিয়াহু গাজার লড়াইকে খুব ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছে। এবং ওখানে চলমান অপারেশনের এই পর্যায়ে এসে IDF এর অফিসাররা অনুভব করতে শুরু করেছে যে, নেতানিয়াহু কিংবা ওয়ার কেবিনেট গাজায় আটকে থাকা ইসরায়েলি বন্দিদের ব্যাপারে আসলে তেমন পরওয়া করে না।
০৭ই অক্টোবরের পর থেকে অনেককেই দেখেছি যুদ্ধবিরতি কিংবা ক্ষমতা হারানোর ভয়কে এই আগ্রাসনের পেছনে বেঞ্জামিনের মূল চালিকাশক্তি হিসাবে ধরেছেন। আমার ধারণা, তারা সকলেই ভুল। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তার রাজনীতিতে আগমন ঘটে জোনাথনের মৃত্যুর পর। খুব মনোযোগের সাথে এই যাত্রা পর্যবেক্ষণ করলে অনেক বিশ্লেষক হয়তো এক্ষেত্রে একমত হবেন যে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক্ষেত্রে চালিকাশক্তি ভয় নয়। ওকে চালিয়ে নিয়ে এসেছে এবং যাচ্ছে ঘৃণা। যার মাত্রা ওর ক্ষেত্রে অন্যান্য ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। ইসরায়েল বুঝেশুনেই তাদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেছে। ওরা জানে, ওরা কি চায়।
Comments
Post a Comment